সাক্ষাৎকার
সারের ঘাটতি নেই সমস্যা ব্যবস্থাপনায়

মোশাররফ হোসেন
সম্প্রতি সার নিয়ে নানা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের হাতে পর্যাপ্ত সার থাকার দাবির বিপরীতে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সময়মতো সার না পাওয়া ও গুদাম লুটের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এসব বিষয়ের পেছনের প্রকৃত চিত্র জানতে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) সভাপতি মোশাররফ হোসেনের মুখোমুখি হয়েছেন অর্থনৈতিক প্রতিবেদক ওবায়দুর রহমান
প্রশ্ন: কৃষকদের সার না পাওয়া ও গুদাম লুটের খবরের বিপরীতে সরকার পর্যাপ্ত মজুদের কথা বলছে। প্রকৃত চিত্র কী?
মোশাররফ হোসেন: দেশে সারের কোনো বাস্তব ঘাটতি নেই; মূল সমস্যা ব্যবস্থাপনায়। ৬৪ জেলার মধ্যে সংকটের অভিযোগ মূলত উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় সীমাবদ্ধ। সস্তা হওয়ায় কৃষকরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার ব্যবহার করছেন। আমবাগান, চা বাগান ও মাছের ঘেরের মতো খাতেও সারের ব্যবহার বেড়েছে। নতুন সরকার গত বছরের সমপরিমাণ সার বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু উত্তরবঙ্গে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত বরাদ্দ অনুমোদনে কিছুটা বিলম্ব হয়। এ সুযোগে গুজব ছড়িয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রশ্ন: বেসরকারি খাতে সার আমদানির অগ্রগতি কতটুকু?
মোশাররফ হোসেন: আমদানির অনিশ্চয়তা কেটে গেছে। সরকার এলসি খোলার অনুমতি দিয়েছে এবং আংশিক চালানও এসেছে। বেসরকারি খাতের মাধ্যমে প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার টন সার আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। আগামী মাসের মধ্যে এসব সার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা। ফলে আমদানিতে বড় কোনো বাধা নেই।
প্রশ্ন: নতুন ডিলারশিপ নীতি ও পুনর্নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আপনাদের আপত্তি কী?
মোশাররফ হোসেন: সরকার প্রতি ইউনিয়নে ডিলারের সংখ্যা একজন থেকে বাড়িয়ে দুজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা ইউনিয়নে বিসিআইসির বিদ্যমান ডিলারের পাশাপাশি একজন নতুন ডিলার রাখার পক্ষে। বিএডিসির বীজ ডিলারদেরও সারের ব্যবসার সুযোগ দিলে কোনো কোনো ইউনিয়নে ডিলার তিনজন হয়ে যাবেন। চাহিদা না বাড়িয়ে ডিলার বাড়ালে ব্যবসার খরচ তোলা কঠিন হবে। এতে অনিয়ম ও বেশি দামে সার বিক্রির ঝুঁকি বাড়তে পারে। নতুন ডিলার নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও তাদের আর্থিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দ্রুত নিয়োগ দিতে গিয়ে অনেক অসচ্ছল ও অনভিজ্ঞ ব্যক্তি সুযোগ পেয়েছেন বলে আমাদের আশঙ্কা। তাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা ডিও বিক্রি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
প্রশ্ন: অতিরিক্ত সার ব্যবহারে মাটির কী ক্ষতি হচ্ছে?
মোশাররফ হোসেন: সস্তা হওয়ায় কৃষকরা অতিরিক্ত সার ব্যবহার করছেন। ডিএপি সারে ইউরিয়া থাকায় এর ব্যবহারেও ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার মাটির স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ধানের গাছ সবুজ দেখালেও কাঙ্ক্ষিত ফলন মিলছে না। ‘বেশি সার মানেই বেশি ফলন’— এ ধারণা থেকে কৃষকদের বেরিয়ে আসতে হবে।
প্রশ্ন: এক্ষেত্রে কৃষি বিভাগের করণীয় কী?
মোশাররফ হোসেন: মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়াতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে প্রদর্শনী প্লট করে পরিমিত ও অতিরিক্ত সার ব্যবহারের ফলন তুলনা করে দেখানো যেতে পারে। পাশাপাশি উঠান বৈঠক, ব্লকভিত্তিক সচেতনতামূলক সভা ও গণমাধ্যমে বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রচার করে কৃষকদের সচেতন করতে হবে।
প্রশ্ন: আসন্ন রবি মৌসুমে সরবরাহ নিশ্চিত করতে আপনাদের প্রস্তুতি ও দাবি কী?
মোশাররফ হোসেন: বোরো, আলু, গম ও ভুট্টার জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতে পর্যাপ্ত সার আসছে। সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে সংকট হওয়ার কথা নয়। তবে পরিবহন, গুদাম ভাড়া ও বিদ্যুৎ খরচ বিবেচনায় ডিলারদের কমিশন বাড়ানো জরুরি। বস্তাপ্রতি কমিশন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ টাকা করা হলেও তা যথেষ্ট নয়। আমাদের দাবি, কমিশন ২০০ টাকা করা হোক। ন্যায্য কমিশন নিশ্চিত হলে সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা সহজ হবে।



