মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনায় শেয়ারবাজারে আতঙ্কের ঢেউ

সংগৃহীত ছবি
একদিন পরেই দেশের শেয়ারবাজার বড় পতনের মুখে পড়ল। এর আগে রবিবার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসেও বড় পতনের মুখে পড়ে বাজার। তবে সোমবার কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থাকলেও আজ (মঙ্গলবার) বড় ধরনের পতনে লেনদেন শেষ হয়েছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা নিহত হওয়ার পর সৃষ্ট বৈশ্বিক সংকটে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ায় শেয়ারবাজার বড় ধাক্কা খায়। সম্পদের মূল্য আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন বিনিয়োগকারীরা দ্রুত শেয়ার বিক্রি করতে থাকেন। যদিও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ২০ দিনের তেলের মজুদ রয়েছে। আরও দুটি জাহাজের এলসি খোলা রয়েছে। মার্চ মাসে তেলের দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে বিনিয়োগকারীরা বিপিসির ঘোষণায় আস্থা পাচ্ছেন না, যার প্রভাব দেখা গেছে মঙ্গলবারের বাজারে।
এদিকে, অর্থনীতিবিদ ও বাজারসংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জাহাজ চলাচলের রুট দীর্ঘ হতে পারে, ভাড়া ব্যয় বাড়তে পারে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। ফলে কোম্পানিগুলোর আয় কমতে পারে, এমনকি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
এমন জটিল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক আগের দিনের তুলনায় বড় পতন নিয়ে লেনদেন শুরু করে। শুরুতেই বিক্রির চাপে সূচক ১০০ পয়েন্টের বেশি কমে যায়, যদিও পরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়।
তবে দিন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স শেষ পর্যন্ত ২০৮.৯৮ পয়েন্ট বা ৩.৭৮ শতাংশ কমে ৫৩২৫ পয়েন্টে দাঁড়ায়। ডিএসইএস ৩.৩০ শতাংশ বা ৩৬.৩৪ পয়েন্ট কমে ১০৬৩ পয়েন্টে এবং ডিএসই৩০ ৪ শতাংশ বা ৮৫.৭২ পয়েন্ট কমে ২০৫০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
ইরানে হামলার ফলে তেল উৎপাদনকারী উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও উদ্বেগে পড়ে। ইরান পাল্টা হিসেবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ইতোমধ্যে বেশ কিছু বড় তেল শোধনাগার আক্রান্ত হয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে আসে।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত তেল এবং কাতার থেকে এলএনজি আমদানি করা হয়। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে বাংলাদেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং তেহরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদন অঞ্চল থেকে রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। টানা তৃতীয় দিনের মতো বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে।
এদিকে, যুদ্ধাবস্থার উদ্বেগের মধ্যে দিন পার করছেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, সংঘাত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বহুমুখী প্রভাব ফেলবে, কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ আকাশপথ বন্ধ হয়ে গেছে। তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। এলএনজি ও ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি প্রতিযোগিতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, বিশেষ করে জ্বালানিনির্ভর খাতে। পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লে নতুন করে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
মঙ্গলবার দিন শেষে ডিএসইতে দাম বাড়ার শীর্ষে ছিল প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড। ১০ শতাংশ দাম বেড়ে ২.২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে কোম্পানিটির শেয়ার দর। ১০ শতাংশ দাম বেড়ে তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডায়িং ছিল দ্বিতীয় স্থানে। এরপরই রয়েছে সিএন্ডএ টেক্সটাইল, জেনেক্স ইনফোসিস, নুরানী ডায়িং অ্যান্ড সোয়েটার, ফাস্ট ফাইন্যান্স, অ্যাপোলো ইস্পাত, জিএসপি ফাইন্যান্স এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক।
অন্যদিকে আজকের লেনদেনে দেখা গেছে খেলনা, সিমেন্ট, খাদ্য, ফার্মা, তামাক ও শিল্প খাতের শেয়ারগুলোতে ব্যাপক দরপতন হয়েছে। ৯.৩৬ শতাংশ দাম কমে দরপতনের শীর্ষে রয়েছে ওয়ান্ডার টয়েজ লিমিটেড। সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ২২.৩০ টাকায়। ৯.২০ শতাংশ দাম কমে ১২৬ টাকায় লেনদেন শেষ হয়েছে নর্দার্ন সিমেন্ট লিমিটেডের। এরপর রয়েছে রহিমা ফুড প্রোডাক্টস, সালাম সিরামিকস, সিলকো ফার্মা, আইএসএন লিমিটেড, ন্যাশনাল ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ওয়েল্ডিং এবং প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স।

