আগামীর সময়

জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৫৮ শতাংশ

জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৫৮ শতাংশ

প্রতীকী ছবি

খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির জেরে টানা তিন মাসের মতো আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৮.৫৮ শতাংশে, যা ডিসেম্বরে ছিল ৮.৪৯ শতাংশ এবং নভেম্বরে ৮.২৯ শতাংশ। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ এ হার গত বছরের মে মাসের পর গত আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

রবিবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল খাদ্যপণ্যের দাম। ওই মাসে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.২৯ শতাংশে, যা ডিসেম্বরে ছিল ৭.৭১ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। টানা চার মাস ধরে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর চাপ আরো বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে কিছুটা স্বস্তির জায়গা তৈরি হয়েছে খাদ্যবহির্ভূত খাতে। জানুয়ারিতে এ খাতে মূল্যস্ফীতির হার কমে দাঁড়িয়েছে ৮.৮১ শতাংশে, যেখানে ডিসেম্বরে ছিল ৯.১৩ শতাংশ। তবে খাদ্যবহির্ভূত খাতে সামান্য কমলেও সার্বিক চিত্রে মূল্যস্ফীতির চাপ কমেনি, কারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয়ের বড় অংশই খাদ্যপণ্যের ওপর নির্ভরশীল।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, গ্রাম ও শহর উভয় এলাকাতেই মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। জানুয়ারিতে গ্রামাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৬৩ শতাংশে, যা ডিসেম্বরে ছিল ৮.৪৮ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮.১৮ শতাংশ, যা এক মাস আগে ছিল ৭.৬৭ শতাংশ। তবে খাদ্যবহির্ভূত খাতে গ্রামাঞ্চলে মূল্যস্ফীতি কমে ডিসেম্বরের ৯.২৬ শতাংশ থেকে জানুয়ারিতে ৯.০৪ শতাংশে নেমেছে।

শহরাঞ্চলেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ডিসেম্বরে শহরাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৫৫ শতাংশ, জানুয়ারিতে তা সামান্য বেড়ে ৮.৫৭ শতাংশ হয়েছে।

শহরে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৬১ শতাংশে, যা ডিসেম্বরে ছিল ৭.৮৭ শতাংশ। বিপরীতে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৫৪ শতাংশে নেমেছে।

মূল্যস্ফীতি বাড়লেও আয়ের ক্ষেত্রে সুখবর নেই। বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, সর্বশেষ নভেম্বর মাসে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.০৮ শতাংশ, যা জানুয়ারির সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ৮.৫৮ শতাংশের চেয়ে কম। অর্থাৎ জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বাড়ছে, মানুষের আয় সে হারে বাড়ছে না। এতে প্রকৃত আয় কমে গিয়ে খেটে খাওয়া মানুষ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর চাপ আরো বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি কার্যত এক ধরনের করের মতো কাজ করে। মানুষের মাসিক আয়ের বড় অংশ যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় হয়ে যায়, তাহলে হঠাৎ দাম বেড়ে গেলে ধারদেনা করা কিংবা খাবার, পোশাক, যাতায়াতসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় কমানো ছাড়া বিকল্প থাকে না। মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধি কম হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বহুগুণ বেড়ে যায়।

বিবিএসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জানুয়ারির মূল্যস্ফীতি মানে হলো গত বছরের জানুয়ারিতে যে পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় পাওয়া যেত, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সেই পণ্য ও সেবা কিনতে খরচ হয়েছে ১০৮ টাকা ৫৮ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকায় ব্যয় বেড়েছে ৮.৫৮ টাকা। এখানে মূল্যস্ফীতি কমে যাওয়া মানেই যে দাম কমেছে, তা নয়; বরং অন্য মাসের তুলনায় মূল্যবৃদ্ধির গতি কিছুটা কম বা বেশি হয়েছে—এই অর্থই বোঝায়।

এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। শবেবরাত উপলক্ষে বাড়তি চাহিদার সুযোগে গরুর মাংস ও মুরগির দাম বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এক সপ্তাহ আগেও যেখানে গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৭৫০ টাকায়, সেখানে এখন তা ৮০০ টাকায় উঠেছে। সোনালি মুরগির দাম বেড়ে কেজিপ্রতি ২৮০ থেকে ৩২০ টাকায় পৌঁছেছে, আর ব্রয়লার মুরগির দাম দাঁড়িয়েছে ১৮০ টাকা কেজিতে। তবে ডিমের বাজার এখনো তুলনামূলক স্থিতিশীল; প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায়।

সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও সামনে রমজান ঘিরে দুশ্চিন্তা রয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ শীতকালীন সবজি ৬০ টাকার মধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে। নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজিতে, পেঁয়াজের দামও তুলনামূলক কম। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সামনে চাহিদা বাড়লে কিছু পণ্যের দাম আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।

টানা তিন মাস মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ফলে নতুন সরকারের সামনে ৮.৫০ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি কমানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে থাকা অর্থনীতিতে এই ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তির বদলে উদ্বেগই বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, খাদ্য খাতের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে মানুষের দুর্ভোগ কমবে না। বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা জরুরি। পাইকারি পর্যায়ে মনোপলি ভাঙা, খাদ্য আমদানিতে শুল্ক কমানো এবং কৃষিপণ্যের সরাসরি বিপণন চ্যানেল শক্তিশালী করতে হবে। না হলে খাদ্যদ্রব্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকবেই।

    শেয়ার করুন: