শেয়ারবাজারে সুবাতস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের শেয়ারবাজারে এখন রীতিমতো সুবাতাস বইছে। টানা পাঁচ সপ্তাহ ধরে বাজারে যে পুনরুদ্ধারের ধারা শুরু হয়েছিল, তা গত সপ্তাহেও অব্যাহত ছিল। বাজেট-পরবর্তী ইতিবাচক মনোভাব এবং বাজার-বান্ধব নীতিমালার কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে আস্থা ফিরে এসেছে। এর ফলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স প্রায় সাড়ে নয় মাস পর আবার ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করেছে। ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে সমাপ্ত সপ্তাহে সূচকটি ১৪১ পয়েন্ট বা আড়াই শতাংশের বেশি বেড়ে ৫ হাজার ৬৬১ পয়েন্টে এসে দাঁড়িয়েছে।
বাজারের এই চাঙ্গাভাবের পেছনে শুধু দেশীয় কারণ নয়, বৈশ্বিক রাজনীতিরও বড় ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্প্রতি যে ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছে, তার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অনেকটাই কমে এসেছে। তেলের দাম কমলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতেও স্বস্তি ফেরে, আর এই আশাতেই বিনিয়োগকারীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাজারে টাকা খাটাচ্ছেন।
এর পাশাপাশি, ইসলামী ব্যাংকের তীব্র তারল্য সংকট কাটানোর খবর বাজারে দারুণ প্রভাব ফেলেছে। শেয়ারটিতে বিনিয়োগকারীদের হুমড়ি খেয়ে পড়ার কারণে সূচকের বড় উত্থান হয়েছে। গত সপ্তাহে বাজারে গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন বস্ত্র, সাধারণ বিমা এবং ওষুধ ও রসায়ন খাতে। সাইফ পাওয়ার, ন্যাশনাল ফিড মিল এবং এসএস স্টিলের মতো শেয়ারগুলো বিনিয়োগকারীদের দারুণ মুনাফা দিয়েছে।
তবে বাজারের এই সার্বিক আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যেও সবার নজর আটকে ছিল বেক্সিমকোর শেয়ারের দিকে। গত সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি লোকসানের মুখে পড়েছে এই জায়ান্ট কোম্পানিটি। দাম এক ধাক্কায় প্রায় ৪০.৭ শতাংশ কমে ৪৭ টাকা ৬০ পয়সায় নেমে এসেছে। অনেকেই চমকে উঠলেও বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি মূলত মুনাফা তুলে নেওয়ার স্বাভাবিক প্রবণতা। গত কয়েক সপ্তাহে শেয়ারটির দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা নিজেদের পকেটে মুনাফা ভরতে শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন। যেহেতু বেক্সিমকো বিবিধ খাতের একটি বড় শেয়ার, তাই এর পতনের কারণে পুরো বিবিধ খাতেই বড়সড় ধাক্কা লেগেছে এবং খাতটি ১৫.৪ শতাংশ নেতিবাচক রিটার্ন দিয়েছে। মূলত বিনিয়োগকারীরা বেক্সিমকো থেকে তাদের টাকা সরিয়ে স্কয়ার ফার্মা বা ইসলামী ব্যাংকের মতো স্থিতিশীল শেয়ারে বিনিয়োগ করেছেন।
বাজারের এই চাঙ্গাভাবের পালে বাড়তি হাওয়া জুগিয়েছে বেশ কয়েকটি শীর্ষ কোম্পানির আকর্ষণীয় লভ্যাংশ ঘোষণার খবর। বার্জার পেইন্টস তাদের বিনিয়োগকারীদের জন্য অভাবনীয় ৫২৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। পিছিয়ে নেই ওয়ালটন হাইটেক, যারা ১৭৫ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছে। এছাড়া স্কয়ার ফার্মা ১২০ শতাংশ নগদ এবং অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার ২৫ শতাংশ নগদ ও ২৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করে বিনিয়োগকারীদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে।
অন্যদিকে, খেলাপি ঋণ নিয়ে বাজারে যে বিভ্রান্তিকর তথ্য ঘুরপাক খাচ্ছিল, তা স্পষ্ট করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারা জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১০.১০ শতাংশ।
সব মিলিয়ে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়া, ভালো মৌলভিত্তির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের বিপুল আগ্রহ এবং আকর্ষণীয় লভ্যাংশ ঘোষণা দেশের শেয়ারবাজারকে এখন বেশ শক্তিশালী ও সম্ভাবনাময় একটি অবস্থানে নিয়ে গেছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা গুজবে কান না দিয়ে বুঝেশুনে ভালো শেয়ারে বিনিয়োগ করলে বাজারের এই উত্থানের সুফল দীর্ঘমেয়াদে ভোগ করতে পারবেন বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।




