চব্বিশে শেয়ারবাজারে ধস লস সেলিং ও গুজবে
- বিএসইসির তদন্ত প্রতিবেদন

সংগৃহীত ছবি
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই আশার প্রদীপ বেশিদিন জ্বলে থাকেনি। বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই নেপথ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। অভিযোগ উঠেছে, পরিকল্পিতভাবে শেয়ার বিক্রি, গুজব ছড়ানো এবং অপপ্রচারের মাধ্যমে বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি করে তারা। ফলে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বড় ধরনের ধস নামে শেয়ারবাজারে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই ষড়যন্ত্রের চাঞ্চল্যকর চিত্র।
তদন্তে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে বিএসইসি বলছে, সুপরিকল্পিতভাবে ‘লস সেলিং’ বা কেনা দামের চেয়ে কম দামে শেয়ার বিক্রি, কৃত্রিম লেনদেন এবং গুজব-অপপ্রচারের মাধ্যমে বাজারে অস্বাভাবিক পতন ঘটানো হয়েছে। এতে ২৩ সদস্যের একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী এবং ১৭ সদস্যের গুজব ও অপপ্রচারকারী একটি চক্র জড়িত ছিল বলে প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
বিএসইসির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শেয়ারবাজারে কিছুদিন ইতিবাচক ধারা দেখা যায়। তবে ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া ধারাবাহিক দরপতনের ফলে ২৭ অক্টোবর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স এক দিনেই ১৪৯ পয়েন্ট কমে ৪ হাজার ৯৬৫ পয়েন্টে নেমে আসে, যা আগের চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থান ছিল।
এ পরিস্থিতির কারণ অনুসন্ধানে গত বছর ২ এপ্রিল উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে বিএসইসি। বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেয়ারবাজারে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি লক্ষ্য করেই পুনর্গঠিত কমিশন বিষয়টি তদন্তের উদ্যোগ নেয়। এরই মধ্যে জমা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন এবং কমিশন প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
তদন্তে ২৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন— তানজির আলম সিদ্দিকী, এ এস এম মইনউদ্দিন মোনেম, সাইফুল ইসলাম, এলিজা রহমান, মো. রিয়াদ চৌধুরী, রেনেটা লিমিটেড, উত্তরা ব্যাংক সিকিউরিটিজ, মো. মাজিদুর রহমান, মো. লোকমান হোসেন আকাশ, ফয়সাল শরীফ, ফরিদ আহমেদ, চন্দন কুমার পাল, নূরুন্নাহার বেগম, হোসাম মো. সিরাজ, মো. জাহিদুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম, এনটিসি এ/সি আরআরএইচ (বিভিআই) লিমিটেড, পিনাকী ধর, কাকলী ধর, ট্রেড নেক্সট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, প্রদীপ ঢালি এবং মমতাজুর রহমান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযুক্তরা বাজারে আতঙ্ক তৈরি করতে বর্তমান বাজারদরের চেয়ে কম দামে বড় অঙ্কের শেয়ার বিক্রি করেন। একই সঙ্গে নেটিংয়ের মাধ্যমে কৃত্রিম লেনদেন, বড় লটে শেয়ার বিক্রি এবং ব্লু-চিপ কোম্পানির শেয়ারে সমন্বিত চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে বাজারকে নিম্নমুখী করা হয়। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ব্র্যাক ব্যাংক, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি), গ্রামীণফোন, বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, ন্যাশনাল ব্যাংক, রেনাটা এবং লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের শেয়ারকে এ কারসাজির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
তদন্তে দেখা গেছে, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে লোকসান মেনে শেয়ার বিক্রি করে বাজারে নেতিবাচক বার্তা ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন। কেউ বাজারদরের নিচে বিক্রি করেছেন বড় লটে শেয়ার, কেউ আবার একই দিনে কিনে কম দামে বিক্রি করে কৃত্রিম চাপ সৃষ্টি করেছেন। বিএসইসির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাজার অস্থিতিশীল এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করা।
তানজির আলম সিদ্দিকী ২০ অক্টোবর ইসলামী ব্যাংকের ১ লাখ শেয়ার গড়ে ৫৪.২৫ টাকায় কিনে ৫৩.৩৩ টাকায় বিক্রি করেন। ডোরিন গ্রুপের কর্ণধার এ এস এম মইনউদ্দিন মোনেম ২৯ সেপ্টেম্বর ৩ লাখ এবং ৬ অক্টোবর ৭ লাখ শেয়ার গড়ে ৫৬.২২ টাকায় বিক্রি করেন, যেখানে অন্যদের গড় বিক্রি ছিল ৫৭.৩৪ টাকা। প্রিমিয়ার ব্যাংক সিকিউরিটিজের সাবেক সিইও সাইফুল ইসলাম ৬ অক্টোবর ৪ লাখ ১৭ হাজার শেয়ার ৫৫.৫১ টাকায় বিক্রি করেন, যখন বাজারে গড় বিক্রি ছিল ৫৭.৫৪ টাকা। এ ছাড়া এলিজা রহমান ৯ অক্টোবর ২৩ হাজার শেয়ার গড়ে ৫৭.৪৮ টাকায় কিনে বিক্রি করেছে ৫৬.৬০ টাকায়। মো. রিয়াদ চৌধুরীও ২৪ অক্টোবর নেটিং করে শেয়ার বিক্রি করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত বাজার অস্থির করতে বেশি দামে কেনা শেয়ার বাজারদরের চেয়ে কম দামে বিক্রি করেন অভিযুক্তরা।
এ ছাড়া বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ারে এনটিসি এ/সি আরআরএইচ (বিভিআই) লিমিটেড ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ১২ লাখ ৭০ হাজার শেয়ার বাজারদরের নিচে বিক্রি করে।
বিএসইসি এসব কর্মকাণ্ডকে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ধারা ১৭(এ) ও ১৭(ডি)-এর লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জরিমানা, বিও অ্যাকাউন্ট স্থগিত এবং শেয়ারবাজারে আজীবন নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
শুধু শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গুজব এবং অপপ্রচার চালিয়েও বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় আরও ১৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে গুজব-অপপ্রচারকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তাদের সবাই আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বিএসইসি বলছে, এসব কর্মকাণ্ড সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘন করেছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জরিমানা, বিও অ্যাকাউন্ট স্থগিত এবং শেয়ারবাজারে আজীবন নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
শেয়ারবাজার টাস্কফোর্সের সদস্য অধ্যাপক আল-আমিন মনে করেন, বাজার পতনের সময় খোলা চোখেই বোঝা যাচ্ছিল যে এটি স্বাভাবিক দরপতন নয়। তার মতে, যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের পরিচয় প্রকাশের পাশাপাশি কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের কারসাজি ঠেকাতে বাজারে রিয়েল-টাইম মনিটরিং ও সার্ভিলেন্স ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।




