বিধিমালা প্রণয়নে কমিটি
বন্ড ছেড়ে প্রকল্পের আয়েই নতুন প্রকল্পে অর্থায়ন

রাষ্ট্রীয় সম্পদ বা আয়যোগ্য মেগা প্রকল্পের বিপরীতে বন্ড ইস্যুর বিধান রেখে নতুন ‘অ্যাসেট ও মর্টগেজ ব্যাকড সিকিউরিটিজ বিধিমালা’ প্রণয়ন করা হচ্ছে। ফলে চলমান মেগা প্রকল্পের আয় দিয়ে নতুন প্রকল্পে অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ লক্ষ্যে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। বিধিমালায় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় স্পেশাল পারপাস ভেহিক্যাল (এসপিভি) গঠনের প্রস্তাবসহ উল্লেখ থাকবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এ বিষয়ে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, কমিশনের লক্ষ্য শুধু নতুন বিধিমালা প্রণয়ন নয়; বরং দেশের বন্ড মার্কেটকে আন্তর্জাতিক মানের কার্যকর করে গড়ে তোলা। বিধিমালা কার্যকর হলে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। প্রকল্পগুলো তার প্রাপ্যগুলোকে এসপিভির কাছে হস্তান্তর করে নগদ টাকা পাবে। এতে প্রকল্পগুলোর কোনো দায় সৃষ্টি হবে না। তবে সিকিউরিটিজ ইস্যু করা এসপিভির দায় বা ঋণ হবে। আর প্রাপ্যগুলো দেখানো হবে এসপিভির সম্পদ হিসেবে।
দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহে কার্যকর ভূমিকা রাখবে
আবুল কালাম
মুখপাত্র, বিএসইসি
বিধিমালা প্রণয়নে গঠিত কমিটির সদস্যরা হলেন— বিএসইসির অতিরিক্ত পরিচালক শেখ মো. লুৎফুল কবির, যুগ্ম পরিচালক সুলতানা পারভীন, উপপরিচালক মোহাম্মদ আসিফ ইকবাল, সহকারী পরিচালক মো. সাগর ইসলাম এবং সহকারী পরিচালক মো. আজিজুর রহমান।
দীর্ঘ ২২ বছরের পুরনো সম্পদভিত্তিক সিকিউরিটি ইস্যু বিধিমালা, ২০০৪ বাতিল করে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। গঠিত কমিটিকে আগামী ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে নতুন বিধিমালার খসড়া জমা দিতে বলেছে কমিশন। ২০২৬-২৭ সালের বিশেষ কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে এ সিদ্ধান্ত।
তথ্যমতে, পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্প থেকে ভবিষ্যতে যে পরিমাণ নগদ অর্থ আয় হবে, সেটিকে সম্পদ হিসেবে জামানত রেখে তহবিল সংগ্রহের আধুনিক প্রক্রিয়াই হলো ‘অ্যাসেট-ব্যাকড সিকিউরিটাইজেশন’। বন্ড বিক্রি করে সংগৃহীত বড় তহবিল দিয়ে নতুন মেগা প্রকল্প, যেমন— নতুন সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেলপথ, গভীর সমুদ্রবন্দর বা আবাসন প্রকল্প নির্মাণ করতে পারবে।
উদাহরণস্বরূপ, পদ্মা সেতুর আগামী ২০ বছরের সম্ভাব্য টোলকে ভিত্তি ধরে বর্তমান মূল্য নির্ধারণ করে বন্ড ইস্যু করা সম্ভব হবে। তবে কাঠামোটির সফল পরিচালনার জন্য বিশেষ উদ্দেশ্যে স্বতন্ত্র আইনি সত্তা বা এসপিভি গঠন করতে হবে। ভবিষ্যৎ আয়ের আইনি অধিকার এসপিভির কাছে হস্তান্তর করা হবে। এসপিভি বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা এবং টোল থেকে অর্জিত আয় দিয়ে বিনিয়োগকারীদের মুনাফা ও মূলধন পরিশোধ করবে। বিকল্প অর্থায়নে বিশ্ব জুড়ে এই মডেলটির ব্যাপক ব্যবহার।
দেশের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থের জোগান সবসময়ই বড় চ্যালেঞ্জ। সেতু, মহাসড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেলপথ, বন্দর বা আবাসন প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে এখনো প্রধান ভরসা ব্যাংক ঋণ। তবে চিত্র বদলানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে ঋণের বিপরীতে বন্ড ছেড়ে অর্থ সংগ্রহের পথ সুগম করতে চায় কমিশন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, নতুন বিধিমালাটি বন্ড ও সুকুক মার্কেটের উন্নয়নে অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে সাফল্য নির্ভর করছে সঠিক প্রতিপালন এবং সম্পদের প্রকৃত মূল্যায়নের ওপর। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে সরকারের পক্ষে মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য বন্ডের মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে মেগা প্রকল্পগুলোতে সরকারের ব্যাংক ও বৈদেশিক ঋণের ওপর কমবে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা।




