ব্যবসায় ধস, শেয়ারে লাফ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের শেয়ারবাজারে বস্ত্র খাতে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ যেন কোনোভাবেই কমছে না। শেয়ারবাজারে গত কয়েক মাসে কোম্পানিটির শেয়ার দর যেভাবে লাফিয়ে বেড়েছে, তা এককথায় নজরকাড়া। তবে শেয়ারের দরে এমন চাঙ্গা ভাব দেখা গেলেও ভেতরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সর্বশেষ উপাত্ত বলছে, শেয়ার দর রেকর্ড স্পর্শ করলেও প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে বড় ধরনের আর্থিক লোকসান ও ব্যবসায়িক মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ব্যবসার ক্ষেত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ মূলত একটি স্পিনিং মিল বা সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। এটি মূলত এক্রিলিক কটন বা সুতি এবং বিভিন্ন সিন্থেটিক সুতা প্রস্তুত ও বাজারজাত করে থাকে। বিশেষ করে দেশের সোয়েটার শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ সহায়তা হিসেবে এক্রিলিক সুতা সরবরাহে কোম্পানিটির বড় ভূমিকা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আগে ‘আর. এন. স্পিনিং মিলস লিমিটেড’ নামে পরিচিত ছিল এবং পরে নাম পরিবর্তন করা হয়।
গত ছয় মাসের বাজার চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অত্যন্ত দ্রুত গতিতে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার দর বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ছয় মাসের ব্যবধানে শেয়ারটির দর প্রায় ১৭০ থেকে ২৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এক বছর আগের যেখানে কোম্পানিটির শেয়ার দর নেমেছিল মাত্র ১০ টাকা ১০ পয়সায়, সেখানে পরে ক্রমাগত দর বেড়ে তা ৩৭ থেকে ৪১ টাকার ঘর ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে শেয়ারটি ৩৫ থেকে ৩৯ টাকার আশপাশে লেনদেন হচ্ছে। তবে আর্থিক ভিত্তির কোনো সুসংবাদ ছাড়াই স্বল্পমেয়াদে শেয়ারের এই অনাকাঙ্ক্ষিত লাফ এবং চরম অস্থিরতা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
কারণ হিসেবে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের দিকে তাকালে দেখা যায় এক হতাশাজনক চিত্র। সাম্প্রতিক প্রান্তিকগুলোয় শেয়ার প্রতি আয় বা ইপিএস ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। চলতি বছরের সর্বশেষ তৃতীয় প্রান্তিক শেষে শেয়ার প্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ০.৭১ টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে কোম্পানিটি সামান্য হলেও মুনাফায় ছিল। ফলে সার্বিকভাবে কোম্পানিটির বাৎসরিক শেয়ার প্রতি আয় ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে মাইনাস ২.৫৪ টাকায়। একই সঙ্গে কমেছে কোম্পানির নিট সম্পদ মূল্য বা এনএভি। আগের বছরের ১০ টাকা ৮ পয়সা থেকে এনএভি কমে এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭ টাকা ৯২ পয়সায়। শেয়ার প্রতি আয় মাইনাসে থাকায় কোম্পানিটির মূল্য-আয় অনুপাত বর্তমানে ঋণাত্মক অবস্থানে রয়েছে।
ব্যবসায়িক মন্দা ও লোকসানের মধ্যে শেয়ারটির এমন অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি ও লেনদেন নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরে এলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কোম্পানির কাছে দর বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, শেয়ারের এই দরবৃদ্ধি বা লেনদেন বাড়ার পেছনে কোম্পানির কাছে অপ্রকাশিত কোনো মূল্য-সংবেদনশীল তথ্য নেই। অর্থাৎ ব্যবসায়িক কোনো নতুন অগ্রগতি, সম্পদ বিক্রি, নতুন বিনিয়োগ বা আর্থিক অবস্থার বড় পরিবর্তনের খবর ছাড়া শুধু গুজবের ওপর ভর করেই শেয়ার দর তড়িৎ গতিতে বেড়েছে, যা স্পষ্ট করে দেয় এই দরবৃদ্ধির নেপথ্যে কোনো মৌলিক ইতিবাচক কারণ নেই।
টেক্সটাইল খাতের ‘বি’ ক্যাটাগরির এই কোম্পানিটির বাজারে মোট শেয়ারের সংখ্যা ৩০ কোটি ৩৫ লাখ। চলতি বছরের জুন মানের তথ্যানুযায়ী, কোম্পানির মোট শেয়ারে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে ৩৬.৬৩ শতাংশ শেয়ার, আর বাকি ৬৩.৩৭ শতাংশ শেয়ার সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ছড়িয়ে রয়েছে।
সার্বিক বিচারে, কোম্পানিটি রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যবসায়িক চাপের মুখে থাকা সত্ত্বেও বাজারে এর দর নাটকীয়ভাবে বাড়ছে। যেখানে শেয়ার প্রতি নিট সম্পদ মূল্য ১০ টাকার নিচে, সেখানে শেয়ারের বাজারদর প্রায় ৪০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছানোকে স্বাভাবিক মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। তাই কোনো ধরনের গুজবে কান না দিয়ে কেবল বর্তমান বাজারে চাঙ্গাভাব দেখে বিনিয়োগ না করে, কোম্পানির ঝুঁকি ও প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা যাচাই-বাছাই করেই বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।





