আগামীর সময়

চট্টগ্রাম বন্দর সচলে প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ চায় ৪ সংগঠন

চট্টগ্রাম বন্দর সচলে প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ চায় ৪ সংগঠন

একের পর এক কর্মবিরতি ও ধর্মঘটে অচল চট্টগ্রাম বন্দরের সংকট কাটাতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ চেয়ে চিঠি দিয়েছে শীর্ষ চার ব্যবসায়ী সংগঠন। জাতীয় নির্বাচনের চার দিন আগে এই ধর্মঘট দেশের অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্য ডেকে আনবে বলে চিঠিতে উদ্বেগ জানান ব্যবসায়ী নেতারা।


নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) ইজারা বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেয়ার প্রতিবাদে রোববার সকাল থেকে বন্দরে চলছে লাগাতার ধর্মঘট। এর আগে শনিবার প্রধান উপদেষ্টাকে খোলা চিঠি দেয় বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ), বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ)।


বিইএফ সভাপতি ফজলে করিম এহসান, বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ও বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল চিঠিতে সই করেন।


এতে প্রধান উপদেষ্টার উদ্দেশে বলা হয়েছে, 'আপনার সুদৃঢ় নেতৃত্বে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে যে সাফল্য প্রদর্শন করেছে, তা সর্বমহলে সমাদৃত। বিশেষ করে, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আপনার অঙ্গীকার আজ বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে। আগামী ৪ দিন পর অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে যে গণতান্ত্রিক উৎসবের আমেজ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, আমরা তার প্রতি পূর্ণ একাত্মতা ঘোষণা করছি...


'তবে অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যখন সমগ্র জাতি একটি ঐতিহাসিক নির্বাচনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে, ঠিক তখনই দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরে একটি গভীর অচলাবস্থার উপক্রম হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক রোববার থেকে ঘোষিত লাগাতার ধর্মঘট ও বহির্নোঙরে কার্যক্রম বন্ধের ডাক শিল্প ও বাণিজ্যে গভীর শঙ্কার সৃষ্টি করেছে।'


নির্বাচনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে শিল্প, বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় আন্দোলনকারী ও বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সব পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতার ভিত্তি নির্মাণ করা প্রয়োজন বলে চিঠিতে মন্তব্য করেন ব্যবসায়ীরা।


নানা আলোচনার পরেও আস্থার সংকটের কারণে কোনো ফলপ্রসূ সমাধান হয়নি বলে জানান তারা। বন্দরে তৈরি হওয়া অচলাবস্থার কারণে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির চিত্র চিঠিতে তুলে ধরেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, 'দেশের ৯৯ শতাংশ কনটেইনার এবং ৭৮ শতাংশ সমুদ্রপথের বাণিজ্য এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হলে তৈরি পোশাকসহ সব প্রধান রপ্তানিখাত অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে।'


বন্দরে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালবাহী জাহাজ খালাস না হলে রমজানে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের। এছাড়া জাহাজ জট ও কার্যক্রম স্থগিতের ফলে প্রতিদিন বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ‘ডেমারেজ চার্জ’ হিসেবে আমদানিকারকদের পরিশোধ করতে হচ্ছে বলেও জানান তারা।


এনসিটির ইজারা নিয়ে বিরোধে কর্মচারি ও বন্দর কর্তৃপক্ষ সাংঘর্ষিক অবস্থানে পৌঁছেছে জানিয়ে উল্লেখ করে ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও তদন্তের উদ্যোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও উত্তপ্ত করে তুলেছে।


জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রধান উপদেষ্টার সরাসরি হস্তক্ষেপ ও স্থায়ী সমাধান চেয়েছে সংগঠনগুলো।


এনসিটির ইজারা আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপিওয়ার্ল্ডকে দেয়ার প্রতিবাদে চলছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকা লাগাতার ধর্মঘট। বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম রোববার সকাল থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়েছে। কাজ বন্ধ আছে বহির্নোঙরেও।


আন্দোলন দমাতে দুইজনকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেয়ার অভিযোগ করেছেন পরিষদ নেতারা। বন্দর ও আশপাশের এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্য।


চার দাবিতে এই কর্মসূচি দেয় পরিষদ। দাবিগুলো হলো, এনসিটি পরিচালনার ভার বিদেশিদের না দেয়ার ঘোষণার দেয়া, বন্দর চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহার, আন্দোলনরত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা না নেয়া।


এই আন্দোলন কর্মসূচি শুরু হয় গত ৩১ জানুয়ারি থেকে। শুরুতে কর্মবিরতির ডাক দেয় বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। পরে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে চলে কর্মসূচি।


প্রথম তিনদিন আট ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করা হয়। পরের তিনদিন টানা কর্মবিরতিতে ছিলেন আন্দোলনকারীরা। নৌ উপদেষ্টার আশ্বাসে শুক্রবার ও শনিবার কর্মসূচি স্থগিত রাখা হলেও দাবি পূরণ না হওয়ায় শনিবার আসে লাগাতার ধর্মঘটের ডাক।


টানা আন্দোলনে কার্যত অচল চট্টগ্রাম বন্দর। বিভিন্ন জেটিতে ১২টি ও বহির্নোঙরে আটকে আছে পণ্যবাহী অর্ধশতাধিক জাহাজ।

    শেয়ার করুন: