ডিজিটাল ঋণ ও এআই ক্রেডিট স্কোরিংয়েই ঘুরবে এসএমই খাতের চাকা

‘ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম এবং ডিজিটাল ঋণ প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে এসএমই ঋণ সহজীকরণ’ শীর্ষক সেমিনার
দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সত্ত্বেও বিপুল সংখ্যক কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তা এখনো ব্যাংক ঋণের সুবিধার বাইরে। প্রচলিত ঋণ প্রক্রিয়ার জটিলতা কাটিয়ে দেশের আরও বেশি এসএমই উদ্যোক্তাকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনতে ডিজিটাল ঋণ ব্যবস্থা চালু এবং তা সহজীকরণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
আজ সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে এসএমই ফাউন্ডেশন এবং এশিয়া ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম এবং ডিজিটাল ঋণ প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে এসএমই ঋণ সহজীকরণ’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব কথা বলেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও নীতি-নির্ধারকরা।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহমেদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এসএমই ফাউন্ডেশনের পরিচালক পর্ষদ সদস্য খালিদ মাহমুদ খান এবং এশিয়া ফাউন্ডেশনের বিএসইএ প্রোগ্রামের টিম লিডার সারা এল. টেইলর। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এসএমই ফাউন্ডেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারজানা খান।
৭৭ শতাংশ উদ্যোক্তাই ঋণের বাইরে : আশঙ্কাজনক চিত্র
সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্যে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতের ঋণের এক করুণ চিত্র ফুটে ওঠে। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সিএমএসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ হলেও, দেশের ১ কোটি ১৭ লাখের বেশি সিএমএসএমই উদ্যোক্তার মধ্যে সরাসরি ব্যাংক ঋণ পান মাত্র ৯ শতাংশ উদ্যোক্তা। এছাড়া ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানের (এমএফআই) মাধ্যমে ঋণ পান আরও প্রায় ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশের প্রায় ৭৭ শতাংশ এসএমই উদ্যোক্তাই এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছেন।
বিশেষ করে নারী-উদ্যোক্তা, নতুন উদ্যোক্তা এবং অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জামানতের অভাব, পর্যাপ্ত ক্রেডিট হিস্ট্রি না থাকা, প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্রের সীমাবদ্ধতা এবং প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে সম্ভাবনাময় বহু উদ্যোগ সময়মতো মূলধনের অভাবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না।
অর্থায়নে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ফিনটেক প্রযুক্তি
এই প্রেক্ষাপটে এসএমই উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং ফিনটেকভিত্তিক উদ্ভাবনী আর্থিক সেবার ব্যবহার বাড়াতে একটি যৌথ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে এসএমই ফাউন্ডেশন ও দি এশিয়া ফাউন্ডেশন।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক বিকল্প ক্রেডিট স্কোরিং পদ্ধতির সম্ভাবনা যাচাই করা, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থায়ন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও তথ্যভিত্তিক সহজলভ্য অর্থায়ন পরিবেশ গড়ে তোলা।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ফিনটেক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই সেমিনারের মূল উদ্দেশ্য ছিল উদ্যোক্তা ও অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার দূরত্বের নিরসন ঘটানো। উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়ার প্রস্তুতি সম্পর্কে সচেতন করা এবং ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরিতে এআই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মত দেন বক্তারা।
‘স্মার্ট এসএমই’ তৈরিতে জোর
সভাপতির বক্তব্যে এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেছেন, ‘বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, ডিজিটাল ব্যবসা পরিচালনা, উদ্ভাবনী আর্থিক সেবা এবং দক্ষ মানবসম্পদের সমন্বিত উন্নয়ন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সরকারের নীতি ও কর্মপরিকল্পনায় উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পের আধুনিকায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি সিএমএসএমই
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশই কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতের।
শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ জোগান দেয় এই সিএমএসএমই খাত, যেখানে বর্তমানে ৩ কোটিরও বেশি জনবল কর্মরত। অধিক জনসংখ্যা ও সীমিত সম্পদের বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এসএমই খাতের অবদান অপরিসীম।
প্রসঙ্গত, ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা এসএমই ফাউন্ডেশন জাতীয় শিল্পনীতি ও এসএমই নীতিমালা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত সংস্থাটির বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সুবিধা পেয়েছেন প্রায় ২২ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, যার মধ্যে ৬০ শতাংশই নারী-উদ্যোক্তা। ডিজিটাল ঋণের এ নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলে দেশে কোটি উদ্যোক্তার ভাগ্যবদলের পাশাপাশি জাতীয় প্রবৃদ্ধিও নতুন গতি পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বিশেষজ্ঞরা।







