বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন
মানি লন্ডারিং ঠেকাতে বেনামে বীমা খোলায় নিষেধাজ্ঞা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কাজে অর্থায়ন প্রতিরোধে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিস্তারিত নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। নতুন নিয়মে বেনামে ও ছদ্মনামে কোনো গ্রাহকের বীমা পলিসি (দাবি) খোলা যাবে না। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের তালিকাভুক্ত ব্যক্তি বা নিষিদ্ধঘোষিত গোষ্ঠী বা সংগঠনের সঙ্গে জড়িতদের পলিসি খোলা বা পরিচালনা করা অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে চিহ্নিত সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী কাজকর্মে অর্থায়নে সম্পৃক্ত তালিকাভুক্ত সন্দেহজনক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িতরা বীমা খুলতে পারবে না।
গতকাল সোমবার এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট দেশে পরিচালিত সব বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছে।
বিএফআইইউ জানিয়েছে, মানি লন্ডারিংয়ে সন্দেহভাজন জটিল, অস্বাভাবিক এবং আপাতদৃষ্টে যেসব পলিসির আর্থিক বৈধ উদ্দেশ্য পাওয়া না গেলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংশ্লিষ্ট রেজল্যুশন এবং দেশের মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কার্যে অর্থায়ন প্রতিরোধের আন্তর্জাতিক মান পূরণে ঘাটতি দেখা গেলে বীমা কোম্পানিগুলো সন্দেহভাজন গ্রাহকের এক দিনে ১০ লাখ টাকা বা তদূর্ধ্ব পরিমাণ নগদ অর্থের লেনদেন করলে এর তথ্য বিএফআইইউতে দাখিল করবে। বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো নগদ লেনদেন রিপোর্টের তথ্য বিএফআইইউতে দাখিলের পর কমপক্ষে পাঁচ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করবে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মানি লন্ডারিংয়ে গ্রাহকের ঝুঁকি বিবেচনার (সিডিডি) জন্য নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীন উৎস থেকে সঠিক তথ্য-উপাত্ত ও নথিপত্রের ভিত্তিতে পরিচিতি নিশ্চিত করতে হবে। সন্দেহভাজনদের অর্থের উৎস যাচাইয়ে বীমা পলিসির তথ্য বা উপাত্ত ও লেনদেন নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিশেষ করে পলিসি নবায়ন ও আর্থিক লেনদেনের সময় মানি লন্ডারিং বা সন্ত্রাসী কাজে অর্থায়নের সন্দেহ দেখা দিলে নজরদারি বাড়াতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে মানি লন্ডারিং বা সন্ত্রাসী কাজে অর্থায়নের ক্ষেত্রে গ্রাহক তথ্য গোপন করেছেন কি না— তা খতিয়ে দেখতে হবে। তাদের সন্দেহজনক লেনদেন বা কার্যক্রম যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করতে হবে। প্রতিটি বীমা প্রতিষ্ঠানকে গ্রাহকের পরিচিতি ও তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। যদি গ্রাহকের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি পলিসি পরিচালনা বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করেন, সেক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি যথাযথভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কি না— তা নিশ্চিত হতে পূর্ণাঙ্গ ও সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
বিএফআইইউ বলছে, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক তালিকাভুক্ত কোনো ব্যক্তি বা নিষিদ্ধঘোষিত সত্তা বলতে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ১৮ নম্বর ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সময়ে সময়ে সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা তফসিলভুক্ত কোনো ব্যক্তি বা সত্তাকে বোঝাবে। বৈদেশিক বাণিজ্য-সংক্রান্ত বীমার ক্ষেত্রে আমদানি-রপ্তানির চুক্তি বা এলসি (ঋণপত্র) নম্বর, তারিখ, মূল্যমান, আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক দেশের নাম এবং পণ্যের বিবরণ যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে শিপিং ডকুমেন্টসহ অন্যান্য দলিল ব্যাংকের রেকর্ডের সঙ্গে যাচাই করতে হবে। ব্যক্তি নয়, এমন প্রতিষ্ঠান বা সম্পত্তির বীমা পলিসির ক্ষেত্রে বীমাগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণকারী শেয়ারহোল্ডার অথবা ২০ শতাংশ বা তদূর্ধ্ব একক শেয়ারহোল্ডারকে পলিসির প্রকৃত সুবিধাভোগী বিবেচনায় প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ব্রোকার, ট্রাস্টি ও পেশাদার মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে গ্রাহকের পক্ষে পরিচালিত পলিসির ক্ষেত্রে আইনগত বৈধতা পর্যালোচনা ও যথার্থতা নিরূপণ করে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। পুনর্বীমার ক্ষেত্রে মূল বীমা করা ব্যক্তি (যেখানে জানা সম্ভব) এবং দাবিদারদের যাচাই করতে হবে, যাতে কোনো নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ব্যক্তি বা সত্তার তহবিল পুনর্বীমা প্রিমিয়ামের মাধ্যমে বীমাব্যবস্থায় প্রবেশ করে সন্ত্রাসী কাজে অর্থায়নের সুযোগ না পায়। পলিসির আবেদনকারী গ্রাহকের পরিচিতি যাচাইয়ে নাম, পেশা, জন্মতারিখ ও বিস্তারিত ঠিকানা এবং জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন সনদ, পাসপোর্ট নম্বর, ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কাজে অর্থায়ন প্রতিরোধে বীমা প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি বিবেচনায় নীতিমালাটি পর্যালোচনা করবে। বীমা খাতকে সন্ত্রাসী অর্থায়নমুক্ত রাখার জন্য বিদ্যমান আইন, বিধিমালা ও বিএফআইইউ কর্তৃক সময়ে সময়ে জারি করা সার্কুলার ও গাইডলাইনে বর্ণিত নির্দেশনাবলি যথাযথভাবে পালনের জন্য প্রতিটি বীমা প্রতিষ্ঠান একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নেতৃত্বে প্রধান কার্যালয়ে একটি ‘কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট’ গঠন করবে।



