আলোর পাঠশালার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
শিক্ষা কার্যক্রম আরও বাড়ানোর প্রত্যাশা

দেশের দুর্গম ও শিক্ষাবঞ্চিত এলাকায় পরিচালিত ‘আলোর পাঠশালা’ কার্যক্রমের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে প্রথম আলো ট্রাস্ট। সংবাদমাধ্যমের বৈশ্বিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল নিউজ মেডিয়া অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত ‘গ্লোবাল মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬’-এ ‘বেস্ট পাবলিক রিলেশনস অর কমিউনিটি সার্ভিস ক্যাম্পেইন (ন্যাশনাল ব্র্যান্ড)’ বিভাগে সম্মানজনক স্বীকৃতি অর্জন করেছে প্রথম আলো। এ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে অংশীজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও পৃষ্ঠপোষকদের নিয়ে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রথম আলো ট্রাস্টের চেয়ারপারসন ও বার্জার বাংলাদেশ–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুপালী চৌধুরী সবাইকে স্বাগত জানান। প্রথম আলোর মহাব্যবস্থাপক আজওয়াজ খান জানিয়েছেন, এ বছরের গ্লোবাল মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডসে ৪৬টি দেশের ২৭৪টি সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান থেকে ৯৬০টি উদ্যোগ জমা পড়ে। একই বিভাগে নিউজিল্যান্ডের স্টাফ গ্রুপও সম্মানজনক স্বীকৃতি পেয়েছে।
প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা জানিয়েছেন, ২০০৯ সালে আলোর পাঠশালা কার্যক্রম শুরু হয়। যেসব দুর্গম এলাকায় কোনো স্কুল নেই, সেখানে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়। বর্তমানে কুড়িগ্রাম, রাজশাহী, ভোলা, নওগাঁ, টেকনাফ, বান্দরবান ও লক্ষ্মীপুরে আটটি আলোর পাঠশালায় ১ হাজার ৬৫০ শিক্ষার্থী বিনামূল্যে পড়াশোনা করছে। গত ১৬ বছরে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী এসব স্কুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি দেড় হাজার মানুষকে কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এই কার্যক্রমে সহায়তা দিচ্ছে সামিট গ্রুপ ও আঞ্জুমান-আজিজ ট্রাস্ট।
প্রথম আলো ট্রাস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ২০০৯ সালে। তবে এর কার্যক্রমের সূচনা হয় ২০০৫ সালে, যখন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান ‘র্যামন ম্যাগসাইসাই’ পুরস্কার লাভ করেন। পুরস্কারের অর্থ অ্যাসিডদগ্ধ নারী, মাদকবিরোধী আন্দোলন ও নির্যাতিত সাংবাদিক সহায়তা তহবিলে প্রদান করা হয়। পরে প্রথম আলোর কর্মীরাও বেতন থেকে অনুদান দিয়ে এ কার্যক্রমে যুক্ত হন।
ট্রাস্টের অন্যতম উদ্যোগ ‘অদম্য মেধাবী’ শিক্ষাবৃত্তি ২০০৭ সাল থেকে চালু রয়েছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ৪৮৬ শিক্ষার্থী এ বৃত্তি পেয়েছেন। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক–এর সহায়তায় বৃত্তি পেয়েছেন ১ হাজার ১৫৩ জন। বর্তমানে ২৬৯ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি পাচ্ছেন। তাদের অনেকে চিকিৎসক, বিসিএস কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
২০১২ সাল থেকে ‘অদ্বিতীয়া শিক্ষাবৃত্তি’র মাধ্যমে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের প্রথম কন্যাসন্তানদের উচ্চশিক্ষায় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবছর ১০ জন শিক্ষার্থী এ বৃত্তি নিয়ে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব উইমেনে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছেন। তাদের কেউ বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় যুক্ত হয়েছেন।
প্রথম আলো ট্রাস্টের মাদকবিরোধী কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৩ সালে। এর মধ্যে রয়েছে অনলাইন ও টেলিফোন পরামর্শসেবা, স্কুলভিত্তিক সচেতনতামূলক আয়োজন এবং মাদকবিরোধী কনসার্ট। ২০০০ সাল থেকে অ্যাসিডদগ্ধ নারীদের সহায়তা কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৪৮৫ জন নারীকে বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর গঠিত ‘মেরিল-প্রথম আলো সহায়তা তহবিল’ থেকে উদ্ধার, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও শিক্ষাসহায়তা দেওয়া হয়। বর্তমানে ২০টি পরিবারের শিশু এই তহবিলের মাধ্যমে শিক্ষাসহায়তা পাচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ কার্যক্রমও পরিচালনা করছে ট্রাস্ট।
অনুষ্ঠানে সামিট পাওয়ার লিমিটেড ও অয়েল অ্যান্ড শিপিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মনিরুল ইসলাম আকন্দ উল্লেখ করেন, আলোর পাঠশালা দেশের প্রান্তিক এলাকায় শিক্ষার সুযোগ তৈরি করছে এবং এ স্বীকৃতি অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসির চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদ সাত্তার জানিয়েছেন, সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি প্রথম আলো ট্রাস্টকে সহায়তা দিচ্ছে। বর্তমানে প্রতিবছর ১০ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়া হলেও ভবিষ্যতে তা ১৫ জনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আইডিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল উদ্দিন বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটি জনকল্যাণমূলক কাজে সিএসআর তহবিল বৃদ্ধি করেছে এবং ভবিষ্যতে প্রথম আলো ট্রাস্টের আরও কার্যক্রমে সহায়তা করবে।
ব্র্যাক ব্যাংকের হেড অব ইন্টারনাল কমিউনিকেশন অ্যান্ড সিএসআর শফিকুর রহমান ভূঁইয়া জানিয়েছেন, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘অপরাজেয় তারা’ বৃত্তির সংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথম আলো ট্রাস্টের চেয়ারপারসন রুপালী চৌধুরী বলেছেন, আলোর পাঠশালার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তাদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। দেশের প্রতিটি জেলায় দুর্গম এলাকায় এ ধরনের স্কুল প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি জনকল্যাণমূলক কাজে সহায়তায় এগিয়ে আসতে সামর্থ্যবানদের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও ট্রাস্টের সদস্য আনিসুল হক বলেছেন, মানুষ ও সমাজের জন্য বিনিয়োগই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। দুর্গম এলাকায় শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোকিত করবে।
প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, ‘সাংবাদিকতার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেও প্রথম আলো বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সহৃদয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় এসব কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।’






