বিনিয়োগ আকর্ষণে মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল
- ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরকে লজিস্টিক হাবে রূপান্তরের উদ্যোগ

শিল্প খাতের বিকাশ, বাণিজ্য প্রসার এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় ধরনের শুল্ককর ছাড় ও নীতিগত সংশোধনের একগুচ্ছ প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণে কাস্টমস আইনে নতুন বিধান সংযোজনের মাধ্যমে মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল (ফ্রি ট্রেড জোন) স্থাপনের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এসব প্রস্তাবনা তুলে ধরেন তিনি।
ফলে শুল্ককর ছাড়াই পণ্য আমদানি করে সেখানে সংরক্ষণ, গ্রেডিং, প্যাকিং, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করা যাবে। এ ছাড়া বাণিজ্য সহজীকরণে বেসরকারি অফডক ও আইসিডি পরিচালনায় বিদেশি মালিকানার সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশের সীমা বিলোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্রিনফিল্ড ইনভেস্টমেন্ট আকর্ষণে বেসরকারি বন্দর ও টার্মিনাল অপারেটর বিধিমালা এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরকে লজিস্টিক হাবে রূপান্তর করতে এয়ারকার্গো অপারেটরস স্টেশন বিধিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা বিস্তর প্রসার ঘটাবে ই-কমার্স খাতের।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘প্রস্তাবিত রাজস্ব নীতিতে শিল্পায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণে বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদন খাতে শুল্ককর রেয়াত এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে প্রণোদনা নতুন বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। তবে নীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেন।’
কর কাঠামো সহজীকরণ এবং করপোরেট করব্যবস্থাকে আরও বিনিয়োগবান্ধব করার জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ থাকলেও ব্যবসার ব্যয় কমাতে বন্দর, কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনে আরও সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করেন বিসিআই সভাপতি। তার ভাষ্য, শুধু কর ছাড় নয়, ব্যবসা পরিচালনার সামগ্রিক খরচ কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
বাজেট প্রস্তাবনায় দেশীয় শিল্পের ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন মেয়াদে রেয়াতি সুবিধা বৃদ্ধি এবং নতুন বিধিমালা প্রণয়নের প্রস্তাবও করেছেন অর্থমন্ত্রী। টেকসই জ্বালানির প্রসারে সৌরবিদ্যুৎ খাতের উপকরণ আমদানিতে শুল্ককর শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। তবে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষায় মাউন্টিং স্ট্রাকচার, লিথিয়াম সেল, ব্যাটারি প্যাক এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার করা হবে ২০২৮ সালের ৩০ জুনের পর।
অন্যদিকে, পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ি (ইভি) উৎপাদনে বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়ভাবে উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী থ্রি-হুইলার ও ফোর-হুইলার শিল্পের যন্ত্রাংশ আমদানিতে ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক ছাড়া সব কর মওকুফ এবং কম মূল্য সংযোজনকারীর ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। স্থানীয় ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক শিল্পের কাঁচামালে ৫ শতাংশের অতিরিক্ত ভ্যাট ও সব শুল্ক মওকুফ করা হয়েছে, যার মেয়াদ থাকবে ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। ই-বাইক উৎপাদন ও পার্টস উৎপাদনে নিয়োজিত ভেন্ডরদেরও দেওয়া হবে রেয়াতি সুবিধা।
ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও রপ্তানি বাড়াতে মোবাইল ফোন, রেফ্রিজারেটর, ফ্রিজার, এসি, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম ও সিসিটিভি ক্যামেরা উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ককর অব্যাহতি বাড়ানো হয়েছে ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। একই মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে কম্পিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদন খাতেও। স্থানীয় সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ ডিজাইন, টেস্টিং ও প্যাকেজিং শিল্পে বিনিয়োগ টানতে ১ শতাংশের অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক এবং অন্য সব কর ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ডের চাহিদা পূরণে সব ধরনের স্মার্ট কার্ড ও ব্যাংক কার্ড উৎপাদনের ১০টি কাঁচামাল আমদানিতে মওকুফ করা হচ্ছে ৫ শতাংশের অতিরিক্ত শুল্ক।
জাহাজ ও ড্রেজার শিল্পকে বৈশ্বিক বাজারে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানির রেয়াতি সুবিধা ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশে পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম-আয়ন, সোডিয়াম আয়ন ব্যাটারি এবং লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি প্যাক উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানিতে শুল্ক ও কর অব্যাহতির সুবিধা ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রদানের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।
এ ছাড়া বিনিয়োগকারীদের স্বস্তি দিতে আগামী অর্থবছর বিদ্যমান করপোরেট কর হার অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে করের আওতা বাড়িয়ে এ হার ধীরে ধীরে কমানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অনলাইনে রিটার্ন দাখিল এবং কর পরিশোধের ব্যবস্থা করে করপোরেট কর পরিপালন সহজ ও ব্যবসাবান্ধব করা হয়েছে। ব্যবসার অনুমোদনযোগ্য খরচের পরিমাণ বৃদ্ধি, অতিরিক্ত নিয়ম কমানো এবং অডিট অটোমেশনের মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে করদাতাদের আয় ও করদায় কমানোর।




