বাজেট নিয়ে সিপিডির মূল্যায়ন
জিডিপি ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অবাস্তব

ছবি: আগামীর সময়
বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে । এই চ্যালেঞ্জিং প্রেক্ষাপটের মাঝেই গতকাল বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেন, যার মূল শিরোনাম ছিল একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির দিকে যাত্রা । তবে প্রস্তাবিত এই বাজেটের বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রাকে অত্যন্ত আশাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এই লক্ষ্যমাত্রা বর্তমান বাস্তবতায় অর্জন করা বেশ কঠিন হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাজেটে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো বাস্তবের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নতুন অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬.৫ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে বিদায়ী অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪.১৪ শতাংশ । অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৬৩ শতাংশ এবং পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে তা ৯.৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কঠোর মুদ্রানীতি ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয় বলে মনে করে সিপিডি।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর অতি-নির্ভরতা অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ঘাটতি অর্থায়নে সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। সরকারের এই বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত বা 'ক্রাউড আউট' করতে পারে, যেখানে এপ্রিলে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ইতিমধ্যে কমে ৪.৭২ শতাংশে নেমে এসেছে।
বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছিল প্রথম ১৮ মাসের মধ্যে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এই লক্ষ্যে বাজেটে স্টার্টআপ এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৪০০ কোটি টাকার তহবিল এবং উদ্ভাবনী স্টার্টআপগুলোর জন্য টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সিপিডি উল্লেখ করেছে যে, এই প্রণোদনাগুলোর পরিসর লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশ সীমিত এবং অন্যদিকে সাভারসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সম্প্রতি হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই হওয়ার মতো ঘটনা সামগ্রিক কর্মসংস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
খাতভিত্তিক বরাদ্দের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি বৈষম্যও দেখা গেছে। শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের ১৩.০৬ শতাংশ (জিডিপির ১.৭৯ শতাংশ) এবং স্বাস্থ্য খাতে ৬.৭০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট বহাল রাখা হয়েছে, যা প্রত্যাহার করার সুপারিশ করেছে সিপিডি । এছাড়া শহর অঞ্চলের জন্য আরবান প্রাইমারি হেলথকেয়ার প্রোগ্রাম (UPHP) বাতিল করার সিদ্ধান্তেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
শুল্ক ও কর নীতিমালায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসার এবং নারী স্বাস্থ্যের বিষয়ে দুই ধরনের বিপরীত চিত্র উঠে এসেছে। বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) উৎসাহিত করতে ২৫ হাজার ডলার মূল্যের ইভি আমদানিতে শুল্ক ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশ করা হয়েছে এবং ইভি চার্জিং স্টেশনের যন্ত্রপাতির শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে শূন্য করা হয়েছে। বিপরীতক্রমে, জীবাশ্ম জ্বালানি চালিত গাড়ির আমদানি শুল্ক ১৫৫.৮৮ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। তবে নারী স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি স্যানিটারি ন্যাপকিন আমদানিতে অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭.৫ শতাংশ করায় এর ওপর মোট করের বোঝা ১৩২.৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সিপিডি এই কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের পাশাপাশি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণের জোর দাবি জানিয়েছে। এছাড়া, সংসদ সদস্যদের এলাকার জন্য সরাসরি ৫ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ বাতিল করে তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি কেন্দ্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সিপিডি তাদের মূল্যায়নে উপসংহার টেনে বলেছে যে, একটি বাজেট আকারে কতটা বড় তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এর বাস্তবায়নের গুণগত মান। এই বিশাল বাজেট দক্ষতার সাথে বাস্তবায়ন করতে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সুফল পেতে হলে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও টেকসই কাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।




