ভুয়া সফটওয়্যারে শতকোটি টাকা লোপাট
সালতা ক্যাপিটালের পর্ষদের ব্যাংক-বিও জব্দের নির্দেশ
- অর্থ ফেরত দিতে বলা হয়েছে বিনিয়োগকারীদের
- ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ
- গা-ঢাকা দিয়েছেন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা

ভুয়া সফটওয়্যারের মাধ্যমে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ব্রোকারেজ হাউজ সালতা ক্যাপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিইও ও পরিচালনা পর্ষদের ব্যাংক ও বিও হিসাব জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয় বিএসইসির পক্ষ থেকে। পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিও হিসাব জব্দ করতে নির্দেশ দেওয়া হয় সিডিবিএলকে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সূত্র জানায়, জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থের প্রকৃত অঙ্ক নিরূপণ করে বিনিয়োগকারীদের ফেরত দিতে বলা হয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ ঘটনার পর থেকে সালতা ক্যাপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সাঈদ মো. শহীদুল্লাহ এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ রেজাউল করিম চলে যান আত্মগোপনে। তাদের মোবাইল ফোন নাম্বার বন্ধ পাওয়া গেছে। অবস্থান দেশে না বিদেশে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে অপরাধীদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে বিএসইসির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম আগামীর সময়কে বলেছেন, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী, অভিযুক্ত সালতা ক্যাপিটালের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কালক্ষেপণ না করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বর্তমান কমিশন।
সূত্র মতে, এ ঘটনায় পুরোপুরি আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে। ফলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ফৌজদারিসহ সিকিউরিটিজ আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর আকস্মিক পরিদর্শনে ব্রোকারেজ হাউজটির পরিচালিত কনসোলিডেটেড কাস্টমারস অ্যাকাউন্টে (সিসিএ) ২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ঘাটতি পায় ডিএসই। বিষয়টি তাৎক্ষণিক বিএসইসিকে জানানো হয়। তৎকালীন কমিশন কালক্ষেপণ না করে ২৬ নভেম্বর ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিস্তারিত খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেয়। তদন্ত কার্যক্রম শেষ করে চলতি বছরের ২১ মে গঠিত কমিটি প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেয়। তদন্ত কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন বিএসইসির অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. ইকবাল হোসেন। ওই তদন্ত প্রতিবেদনেই বিনিয়োগকারীদের ১০০ কোটি ৫২ লাখ টাকার শেয়ার ও নগদ অর্থ লোপাটের তথ্য উঠে আসে। এর ধারাবাহিকতায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যাংক ও বিও হিসাব ফ্রিজ, বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং সিকিউরিটিজ ও ফৌজদারি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি।
সূত্র আরও জানায়, সালতা ক্যাপিটালের প্রায় ১৪ হাজার গ্রাহকের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্টে থাকা ৪ কোটি ৩২ লাখ ১৬ হাজার ৬৪৩টি শেয়ার গোপনে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে, যার মোট বাজারমূল্য ৭২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। ওই অর্থের পুরোটাই তুলে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ব্রোকারেজ হাউজের সিসিএ থেকে নগদ ২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৫ সালের শুরু থেকেই ধীরে ধীরে শেয়ার বিক্রি ও অর্থ লোপাটের কার্যক্রম শুরু করা হয়। এ ঘটনা নজরে আসার পর প্রতিষ্ঠানটির সব ধরনের নবায়নপ্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয় বিএসইসি। এর ধারাবািহকতায় চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ব্রোকারেজ হাউজের ট্রেড ও ডিপি অপারেশন বন্ধ হয়ে যায়।
জানা গেছে, অসংশোধনযোগ্য ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর না হওয়া এবং তাৎক্ষণিক জালিয়াতি সংযুক্তকরণ সফটওয়্যার না থাকায় শেয়ারবাজারে ধারাবাহিক অর্থ লোপাট রোধ করা যাচ্ছে না। এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধে এর মধ্যে ডিএসই-আইএমওএন (ডিএসই-ইন্টিগ্রেটেড মনিটরিং প্ল্যাটফর্ম) নামে একটি সফটওয়্যার চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এটি চালু হলে সিসিএ থেকে বিনিয়োগকারীদের অর্থের অননুমোদিত স্থানান্তর দ্রুত শনাক্ত করা যাবে। বর্তমানে সফটওয়্যারটি তৈরি প্রক্রিয়াধীন।
এদিকে অনুমোদনহীন ডুপ্লিকেট ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার করে সিডিবিএলে গ্রাহকের মোবাইল ফোন নাম্বার পরিবর্তন করে নিজেদের নাম্বার যুক্ত করে দেয়। ফলে শেয়ার লেনদেনের এসএমএস প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছায় না, উল্টো ভুয়া স্টেটমেন্ট পাঠানো হয়। পরে পোর্টফোলিওর শেয়ার বিক্রি এবং নগদ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বললেন, শেয়ারবাজারে ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার পূর্ণাঙ্গ কার্যকর না হওয়ায় কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি হচ্ছে। আগামীতে এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করছে ডিএসই।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯-২৪ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে অনুমোদনহীন ডুপ্লিকেট ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার করে ছয়টি ব্রোকারেজ হাউজ প্রায় ৩০ হাজার বিনিয়োগকারীর ৫৫০ কোটির বেশি টাকা আত্মসাৎ করেছে। এর মধ্যে মশিউর সিকিউরিটিজ থেকে ১৬১ কোটি, বানকো সিকিউরিটিজ থেকে ১৩৬ কোটি ৮৪ লাখ, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ থেকে ৬২ কোটি ৯৮ লাখ, তামহা সিকিউরিটিজ থেকে ৫১ কোটি ৩০ লাখ, শাহ মোহাম্মদ সগীর সিকিউরিটিজ থেকে ১৩ কোটি ৩২ লাখ এবং ফার্স্টলিড সিকিউরিটিজ থেকে ১০ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে।




