ঋণ করে আমানত ফেরত দিচ্ছে ন্যাশনাল ব্যাংক
- ১৫ অক্টোবর থেকে টাকা পাবেন গ্রাহকরা
- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে তারল্য দিচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংক
- তারল্য মজুদের প্রাথমিক লক্ষ্য ১৫-২০ হাজার কোটি টাকা
- ঋণের গ্যারান্টার বাংলাদেশ ব্যাংক

সংগৃহীত ছবি
গ্রাহকের আমানত ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে খেলাপি ঋণে জর্জরিত ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি। আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে পরিশোধ করা হবে চাহিদামতো টাকা। চরম তারল্য সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানটি এমন ঘোষণা দিলেও জানানো হয়নি আনুষ্ঠানিক কোনো রূপরেখা। এতে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নানা জল্পনা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নির্দেশনায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে প্রাথমিকভাবে মিলেছে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তার প্রতিশ্রুতি। এই ধারের টাকার গ্যারান্টার হবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপরও গ্রাহকের চাহিদা না মিটলে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাসও দিয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রক্রিয়ার জন্য ছাপানো হবে টাকা, তা বাণিজ্যিক ব্যাংক ঘুরে ন্যাশনালের হাতে পৌঁছাবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা।
ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন আগামীর সময়কে গতকাল বৃহস্পতিবার বললেন, ‘আমি সম্প্রতি দায়িত্ব পেয়ে জানতে পারি যে, গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়া বন্ধ রয়েছে। এটি ব্যাংকিং না। সেজন্য গ্রাহকের জন্য সব দুয়ার খুলে দিয়ে ব্যবসা করবে ব্যাংকটি। টাকা যাবে আবার ফিরে আসবে। সেই লক্ষ্যে ২২১টি শাখা স্বাভাবিক করা হবে। এটিএম বুথ খুলে দেওয়া হবে। ১৫ অক্টোবর থেকে কেউ খালি হাতে ফিরবে না। এটা খুশির খবর। আর খেলাপিদের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি দেখাবে ব্যাংক।’ তবে সংকটে থাকা ব্যাংকটির এত টাকার উৎস কী— এর জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল জানায়, আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দিতে ১৫ অক্টোবর থেকে ন্যাশনাল ব্যাংকের সব শাখা ও এটিএম বুথে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। ফলে ব্যাংকটির গ্রাহকরা স্বাভাবিকভাবে অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে ওইদিন সকালে ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হক সাক্ষাৎ শেষে এ তথ্য জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান, কবির আহমাদ, সরোয়ার হোসেন ও আনিছুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানালেন, ন্যাশনাল ব্যাংক ১৫ অক্টোবর থেকে সব গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে। সেই টাকা ঋণ হিসেবে দেবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। যার গ্যারান্টার থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংক। টাকার পরিমাণ কত, তা নির্ধারণ করা হয়নি। তবে প্রাথমিকভাবে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা দেবে ব্যাংকগুলো। তাতে চাপ সামলানো না গেল তাৎক্ষণিক সহায়তা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
তথ্য বলছে, গত জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ১৩ কোটি টাকা। যার মধ্যে খেলাপি ২৮ হাজার ১৮৫ কোটি, যা মোট ঋণের ৬৫ দশমকি ৪৬ শতাংশ। একই সময়ে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। ব্যাংকটির চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে লোকসান হয়েছে ২ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। আর প্রতি শেয়ারে লোকসান ৭ দশমিক ১০ শতাংশ। ২০২৫ সালে লোকসান ছিল ৯৮৫ কোটি টাকা। তখন প্রতি শেয়ারে লোকসান ছিল ৩ দশমিক ৬০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দীর্ঘদিন ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপের পর গ্রুপটি প্রতিষ্ঠানটির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। ব্যাংকটির বর্তমান পরিচালনায় যুক্ত রয়েছেন মাল্টিমোড গ্রুপ, হোসাফ গ্রুপ ও আর্মানা গ্রুপ পরিবারের সদস্যরা। আগের অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে ব্যাংকটি এখনো সংকটে ভুগছে। যেমন খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, টানা লোকসান ও টাকা তুলতে গ্রাহকদের সমস্যা। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিভিন্ন সময় তারল্য সহায়তা দিলেও শুরু হয়নি ব্যাংকটির স্বাভাবিক লেনদেন। আর সুশাসনের অভাব ও ব্যবস্থাপনায় অস্থিরতার কারণে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে পদত্যাগ করেন একের পর এক শীর্ষ কর্মকর্তা। কোনো ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। এমনকি ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে দায়িত্ব নেওয়া এমডি তৌহিদুল আলম খান মাত্র এক বছরের মাথায় পদত্যাগ করেন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে।



