পরীক্ষা ছাড়া ‘এস আলম স্টাইলে’ অগ্রণী ব্যাংকে নিয়োগ
- ৭০০ দৈনিক মজুর নিয়োগে বেপরোয়া কর্তৃপক্ষ
- ৩২ বছর বয়সসীমা মানা হচ্ছে না

রাষ্ট্রমালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকে ২০১০ সালে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পায় প্রায় ৭০০ কর্মচারী। তাদের নিয়োগে ছিল না কোনো লিখিত পরীক্ষা। ছিল না মৌখিক পরীক্ষার বালাইও।
অনেকটা বহুল আলোচিত ইসলামী ব্যাংকে ‘এস আলম স্টাইলে’ শুধু জীবনবৃত্তান্ত বা জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়েই নিয়োগ পান তারা। অভিযোগ আছে, এসব নিয়োগের নেপথ্যে ছিল মোটা অঙ্কের লেনদেন। অবশ্য তাদের স্থায়ী করার কোনো শর্ত বা আশ্বাস ছিল না সে সময়। তবু পরে ‘ক্ষমতাসীনদের লোক’ কিংবা ‘মানবিক’ বিবেচনায় স্থায়ী করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন তারা। কিন্তু কোনো সরকারই যোগ্যতা, শৃঙ্খলা এবং বাড়তি বোঝার অজুহাতে স্থায়ী করেনি তাদের। কিন্তু হঠাৎ করেই অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, ব্যাংকটির পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনা কমিটি বিদ্যমান আইন, বিধিকে উপেক্ষা করে মজুরিভিত্তিক অস্থায়ী কর্মচারীদের ‘সহকারী কর্মকর্তা’ হিসেবে নিয়োগ দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এজন্য সংশোধন করা হচ্ছে ব্যাংকের নিয়োগ-সংক্রান্ত প্রবিধানমালা। এই উদ্যোগকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মদদপুষ্টদের পুনর্বাসন হিসেবে আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন খোদ ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ।
অগ্রণী ব্যাংকের এইচআর প্ল্যানিং ডিভিশনের ১২৯১নং স্মারক (২০২৬) অনুযায়ী, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা-২০০৮ ‘হালনাগাদকরণের এবং অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি, (কর্মচারী) চাকরি প্রবিধানমালা-২০২৫’ খসড়া প্রস্তুত করতে সাত সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। সেই কমিটি গত ১২ এপ্রিল থেকে ২০ সেপ্টেম্বর সাতটি সভার আয়োজন করে। সেখানে প্রস্তাবিত ‘অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি, (কর্মচারী) চাকরি প্রবিধানমালা-২০২৫’-এ অন্তর্ভুক্ত খসড়া তফসিল-২-এর ক্রমিক নম্বর ২৯-এ ‘সহকারী কর্মকর্তা’ পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে শর্ত শিথিল করা হয়।
যদিও চলতি বছরের ১৯ আগস্ট ব্যাংকটির চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদের ১০২৮তম সভায় অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (সহকারী কর্মকর্তা) পদে নিয়োগে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর শিথিল করার সিদ্ধান্ত হয়; যা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্বশাসিত সংস্থাসমূহে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে নির্ধারিত সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা অনূর্ধ্ব ৩২ বছরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নথিপত্র বলছে, অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি (কর্মচারী) চাকরি প্রবিধিমালা ২০২৫ প্রণয়নে লঙ্ঘন করা হয়েছে নানা শর্ত। প্রবিধিমালা বিভিন্ন পদে ব্যাখ্যা ও নিয়োগের শর্তে নেওয়া হয়েছে জালিয়াতির আশ্রয়।
অগ্রণী ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, ব্যাংকের খেলাপি ৪০ শতাংশের বেশি। আছে ১৩ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি। এখন যদি ৭০০ জনকে সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, তবে তাদের বেতন-ভাতা বাবদ খরচ হবে বিপুল অর্থ। এ ছাড়া তাদের বসার জায়গাই দেওয়া যাবে না। ভেঙে পড়বে ব্যাংকের শৃঙ্খলা। সব মিলিয়ে লোকসান হবে প্রতিষ্ঠানটির।
তারা বিষয়টিকে এস আলমের মতো বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগের সঙ্গে তুলনা করে বলছেন, যোগ্যতা যাচাই না করে ঢালাওভাবে স্থায়ী করা ব্যাংকের জন্য বুমরোং হবে। তা ছাড়া তারা আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পেয়েছেন। বিএনপি কেন তাদের পুনর্বাসন করছে, সে প্রশ্নও তাদের।
তথ্য বলছে, ব্যাংকের যেসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর অভিজ্ঞতা আবশ্যক নয়, এরূপ এন্ট্রি পদসমূহে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে অধিকতর স্বচ্ছতা এবং আবেদনের সুযোগের সমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যাংকের ওয়েবসাইট এবং কমপক্ষে দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশ করতে হবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি। এন্ট্রি পদে কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে সশরীরে অংশগ্রহণ বা অনলাইন অ্যাসেসমেন্ট প্রক্রিয়ায় নৈর্ব্যক্তিক অথবা লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি মৌখিক পরীক্ষা আবশ্যক।
তবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (গ্রেড-১১) নতুন পদ সৃষ্টি করেছে। সেখানে সরাসরি নিয়োগের বিষয়ে ‘কৌশলে কোনো’ সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এভাবে অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (গ্রেড-১১) সরাসরি নিয়োগের বিষয়ে কোনো পরীক্ষার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি কোনো পত্রিকায় দেওয়া হয়নি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিআরপিডি-১ সার্কুলার নং-১৮/২০২৬-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ চেয়ারম্যান আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘২০১০ সালে উল্লিখিত ৬৯৮ জন দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের চাকরি স্থায়ী করা সরকারি কমিটমেন্ট। বোর্ড তা অনুমোদন করছে। বয়স শিথিল করা হয়েছে। সবকিছু ক্লিয়ার করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে। আশা করি ৩২ বছর বয়সের শর্ত বাধা হবে না। তাদের পদবিও বাধা হবে না। কেননা, আমরা তো নতুন কাউকে নিয়োগ দিচ্ছি না। তারা আগে থেকে ব্যাংকের কাজে জড়িত। মূলত যারা আছেন, তারাই স্থায়ী নিয়োগ পাচ্ছেন। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ গাইডলাইন দিয়েছে, তা অনুযায়ী এ নিয়োগ স্থায়ী করা হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অস্থায়ী ভিত্তিতে চাকরিপ্রাপ্তদের আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক েমা. শাহীন আক্তার আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমারা আর নতুন করে টাকা দেব না। আগেই দিতে দিতে শেষ। এখনো আমাদের ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা ঘুষের সুযোগ নেই। আর এ মাসে নিয়োগ স্থায়ী হবে আশা করা যায়।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেছেন, সরকার কর্তৃক গঠিত বোর্ড যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো বক্তব্য নেই। এটা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত। আইন বা বিধির ব্যাখ্যা দিতে পারবে তারা।’



