লুটপাটে ধ্বংসের পথে আইএফআইসি ব্যাংক

প্রায় ৫০ বছরের পুরনো আইএফআইসি ব্যাংক বর্তমানে আর্থিক সংকটে রয়েছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এই ব্যাংকটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে সঞ্চিতি ঘাটতি, সুদ আয়ের তুলনায় সুদ ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিচালন ও নিট লোকসানের চিত্র উঠে এসেছে। বছর শেষে ব্যাংকটির ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ হাজার ২১৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। একই বছর ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৩৬৫ কোটি ৪৬ লাখ এবং কর-পরবর্তী নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৬১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। আগের বছরও লোকসানে থাকা এই ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে ২০২৫ সালে।
দি ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) সাবেক সভাপতি এ এস এম শায়খুল ইসলাম বললেন, ‘দেশের ব্যাংক খাতের অর্থকে ঋণের নামে লুটপাট করা হয়েছে, এটি সবাই জানে। এ কারণেই বেশ কিছু ব্যাংক এখন খেলাপিতে ভুগছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক এ সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে চাচ্ছে। দেখা যাক কতটা সফল হয়।’
১৯৭৬ সালে আইএফআইসি প্রথমে যৌথ উদ্যোগের আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৩ সালে এটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপ নেয়। ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি প্রশ্নের মুখে। ঋণঝুঁকি সামাল দিতে ব্যর্থতা এবং সঞ্চিতি সংরক্ষণে ঘাটতি এ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের নেতৃত্ব ও প্রভাব নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল অতীতে। ঋণ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও মামলা করা হয়েছে।
বার্ষিক প্রতিবেদনের ব্যবস্থাপনা আলোচনায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিনিয়োগের বিপরীতে ২২ হাজার ১০ কোটি ৯৫ টাকা সঞ্চিতি প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করেছে ৭৯২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ২১৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, পরিচালন মুনাফা না থাকায় নতুন করে সঞ্চিতি সংরক্ষণ সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে ঘাটতি সমন্বয় না করেই প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়েছে।
২০২৫ সালে ব্যাংকটির সুদ আয় হয়েছে ২ হাজার ২১০ কোটি ২১ লাখ, যা ২০২৪ সালে ছিল ৪ হাজার ১৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এক বছরে সুদ আয় কমেছে ১ হাজার ৮০৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা। বিপরীতে আমানত ও ঋণের সুদ ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৪১৯ কোটি ৬৭ লাখ। আগের বছর ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৭৪১ কোটি ১৭ লাখ টাকা। ফলে সুদ আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান ঋণাত্মক ২ হাজার ২০৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা হয়েছে।
সুদ আয় ও ব্যয়ের এই ব্যবধানকে পরিচালন লোকসানের অন্যতম কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান ২ হাজার ৩৬৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা হয়েছে। আগের বছর লোকসান ছিল ৫৪ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। ঋণমানের অবনতি এবং নিট সুদ আয়ের পতন এই লোকসানের মূল কারণ। এর প্রভাব শেয়ারপ্রতি মুনাফায়ও পড়েছে। ২০২৫ সালে নিট লোকসান ২ হাজার ৫৬১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা হয়েছে। ২০২৪ সালে লোকসান ছিল ১০২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
শেয়ারপ্রতি লোকসান ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ টাকা ৩৩ পয়সা। আগের বছরের ২১৫ কোটি ৭২ লাখ টাকার সঞ্চিত মুনাফার উদ্বৃত্ত ২০২৫ সাল শেষে ঋণাত্মক ২ হাজার ৩৪৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। অন্যদিকে সমন্বিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পরিচালকদের ফি ও সম্মানী খাতে ব্যয় হয়েছে ৬৬ লাখ ১ হাজার ৮৩৩, যা আগের বছর ছিল ৫০ লাখ ৫৭ হাজার ৯৮৪ টাকা।
নিরীক্ষকের প্রতিবেদনে ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি নির্ধারণ এবং সুদ আয় স্বীকৃতিকে গুরুত্বপূর্ণ নিরীক্ষা-বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুদ আয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ভুল বা জালিয়াতির ঝুঁকি থাকতে পারে বলে উল্লেখ রয়েছে। সঞ্চিতি ঘাটতি ও ঋণমানের অবনতির সঙ্গে এই নিরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদন এবং ঝুঁকিব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে।
এসব বিষয়ে জানতে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হুসাইন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মনসুর মুস্তফার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।



