সেমিনার
চামড়া শিল্প রক্ষায় প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা

‘অস্তিত্ব সংকটে চামড়াশিল্প: উত্তরণের উপায় অনুসন্ধান’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা - আগামীর সময়
অভিভাবকহীনতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে ধ্বংসের মুখে পড়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী চামড়া শিল্প। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই শিল্পের সঠিক ও সময়োপযোগী অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। একই সঙ্গে চামড়া খাতের একক অভিভাবক হিসেবে একটি শক্তিশালী ‘লেদার বোর্ড’ বা ‘স্বতন্ত্র চামড়া মন্ত্রণালয়’ গঠন এবং সংকট কাটাতে অবিলম্বে ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করা জরুরি।
শনিবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে লেদার ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ (এলআইডিএফবি) আয়োজিত ‘অস্তিত্ব সংকটে চামড়াশিল্প: উত্তরণের উপায় অনুসন্ধান’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব কথা বলেছেন বক্তারা। অনুষ্ঠানে এই শিল্পের টেকসই উন্নয়নে সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হয় ১৩ দফা দাবি।
সেমিনারে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন এলআইডিএফবির সভাপতি সাদাত হোসেন সেলিম। তার মতে, ‘একক কোনো অভিভাবক নেই চামড়া খাতের। দীর্ঘদিন ধরেই এই শিল্পের অগ্রগতি নিয়ে বিগত সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব দেখেছি আমরা।’
সাভার চামড়া শিল্প নগরীর সিইটিপির তীব্র সমালোচনা করে তিনি বললেন, ‘কাগজে-কলমে এর বর্জ্য শোধনের ক্ষমতা ২৫ হাজার কিউবিক মিটার বলা হলেও বাস্তবে তা মাত্র ১৪ হাজার। বুড়িগঙ্গা বাঁচাতে গিয়ে আমরা মেরে ফেলছি ধলেশ্বরী ও তুরাগকে। অথচ আমলারা ছাগল পালন শিখতে বিদেশ গেলেও এ খাতের উন্নয়নে আমলাতন্ত্রের কোনো চেষ্টা নেই।’
সাদাত হোসেন সেলিমের দাবি, প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে কোরবানির ঈদের ৩০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়। অথচ এই খাতে সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত ও মনোযোগ দিলে বছরে অন্তত ২৫-৩০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য করা সম্ভব।
সেমিনারে আমন্ত্রিত অতিথি ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেনের ভাষ্য, ‘অতীতে চক্রান্তে পাটশিল্পের পর এবার চামড়াশিল্পও ধ্বংসের মুখে।’
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমীন এ খাতে বিপুল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা উল্লেখ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে দ্রুত কোল্ড স্টোরেজ বা সংরক্ষণাগার তৈরির দাবি জানান। অন্যদিকে, ‘বেফাক’-এর মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক উদ্বেগ প্রকাশ করেন, ‘দেশের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ চামড়া মাদ্রাসাগুলো সংগ্রহ করে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় মাঠপর্যায়ের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার কারণে আগামীতে তারা চামড়া সংগ্রহ বন্ধ করে দিতে পারে।’
সংগঠনটির অন্যান্য মূল দাবির মধ্যে রয়েছে—তৈরি পোশাক খাতের মতো সমপরিমাণ রপ্তানি প্রণোদনা দেওয়া, সাভারের সিইটিপিকে কার্যকর করে ক্ষমতা বাড়ানো, সুনির্দিষ্ট ‘লেদার গুডস ফুটওয়্যার সিটি’ ও কেমিকেল জোন প্রতিষ্ঠা করা এবং চামড়া সংগ্রহে ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহকে (নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী) অন্তর্ভুক্ত করা।
ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন, লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের সনদ না থাকায় বাংলাদেশ ইউরোপ-আমেরিকায় চামড়া রপ্তানি করতে পারছে না। আর এই সুযোগে চীন নামমাত্র মূল্যে বাংলাদেশের চামড়া কিনে নিচ্ছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে অবিলম্বে আমলাতন্ত্রের দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা দূর করে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
অনুষ্ঠানে বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমতুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক ড. এম এ সবুর ও ড. এম এ মুতালিব, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী এবং এলআইডিএফবি-এর সদস্য সচিব এম মোফাজ্জল ইবনে মাহফুজসহ খাত সংশ্লিষ্ট নেতারা বক্তব্য রাখেন।






