সেই বাণিজ্য চুক্তিতে বড় রাজস্ব হারানোর শঙ্কা দেখছে সিপিডি

সংগৃহীত ছবি
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বরাবরই ‘ক্রিটিক্যাল’ বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। নির্বাচনের পর চুক্তি বিশ্লেষণ করে সংস্থার গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছিলেন, চুক্তিটি চরমভাবে বৈষম্যমূলক। চুক্তির শর্ত দেখে তারা হতভম্ব।
এবার সংস্থাটি জানাল, এই বাণিজ্য চুক্তির কারণে বছরে শুল্ক বাবদ প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে সরকার। এমনকি ওই চুক্তির কারণে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা- ডব্লিউটিও এর আওতাভুক্ত অন্যান্য দেশকেও একই সুবিধা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় ঝুঁকি।
রাজধানীর ধানমন্ডির কার্যালয়ে মঙ্গলবার গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করে বেসরকারি এই সংস্থাটি। ‘২০২৬-২৭ অর্থ বছরের বাজেট সুপারিশালা’ শীর্ষক বৈঠকে তুলে ধরা হয় নতুন এসব তথ্য।
‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির আওতায় আমেরিকা থেকে সাড়ে ৪ হাজার পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ২১০ প্রকারের পণ্যে শুল্কমুক্তি সুবিধা দেবে। এ কারণে বছরে সরকার আমদানি শুল্ক বাবদ প্রায় ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে। ওই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে একতরফাভাবে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দিয়েছে, যা ডব্লিউটিও- এর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর ফলে ডব্লিউটিও এর আওতায় সদস্য অন্যান্য দেশকেও একই সুবিধা দিতে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে’- ব্যাখ্যা করলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
‘আরেকটি বিষয় হচ্ছে ওই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট পণ্য ক্রয়ের শর্ত। এ কারণে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ এই চুক্তিতে রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের যে বিষয়টি রয়েছে, সরকারকে সেটা পুনর্মূল্যায়ন করার দরকার। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে’- অভিমত ফাহমিদার।
এক প্রশ্নে সিপিডির ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমানের জবাব- ‘বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়ে গেছে। এটা ডব্লিউটিওকে দুর্বল করেছে। চুক্তির বিষয়টি উন্মুক্ত করতে হবে। কারণ এর ভেতর অনেক আর্থিক নেতিবাচক টুলস রয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নের বড় অংশ ব্যক্তি খাত। আর ব্যক্তিখাত ইউএসএ থেকে আনতে বাধ্য করার জন্য ভর্তুকি দিতে হবে সরকারকে। না হলে সে কেন ইউএসএ থেকে আমদানি করবে... আরও অনেক বিষয় রয়েছে, যেমন-তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে, কার কাছ থেকে কিনতে পারব, কার কাছ থেকে কিনতে পারব না... এগুলো সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও সাংঘর্ষিক। ইউএসএ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার পর আমাদের আলোচনার দ্বার উন্মোচন হয়েছে। আমাদের পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে।’
বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা।
‘বাজেটে মূল বিষয় হচ্ছে রাজস্ব আদায়। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি উল্লেখযোগ্য। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ১২.৯ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪.৫ শতাংশ হারে। বাকি সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ৫৯.৪ হারে রাজস্ব আদায় করতে হবে। যা অসম্ভব। কারণ এখন পর্যন্ত রাজস্ব ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। বাকি সময়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ চ্যালেঞ্জিং বিষয়...’
‘... রাজস্ব আদায় যেহেতু কম, সে কারণে ব্যাংকের ওপর নির্ভশীলতা অনেক বেড়েছে। চলতি অর্থ বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং সেক্টর থেকে ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। বিপরীতে ব্যাংক বহির্ভূত ঋণ ও বৈদেশিক সাহায্য উল্লেখযোগ্য হারে কমে গিয়েছে। ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ আর্থিক খাতে ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ কমে গেছে। এই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ শতাংশের উপরে’- যোগ করেন ফাহমিদা।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ঘিরে জ্বালানি সংকট চলতে থাকলে মূল্যস্ফীতির অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে জানিয়ে তিনি বললেন, ‘আমাদের জ্বালানির বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। অন্যদিকে বার্ষিক উন্নয়নেও ধীরগতি। জানুয়ারি পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ২০.৩ শতাংশ, যা বিগত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। চলতি অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৩.২ হারে কমেছে। বিপরীতে জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি বেড়েছে ৩.৯ শতাংশ হারে।’
তার পরামর্শ, আগামী অর্থবছরের বাজেট দেওয়ার সময় উচ্চাভিলাষী প্রবণতা থেকে সরে আসতে হবে সরকারকে। কারণ চলতি অর্থবছরে অনেক বেশি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেও তা অর্জনের কাছাকাছি যেতে পারিনি তৎকালীন সরকার।
পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয়ও কমাতে হবে বলে মত সিপিডির।

