রাজশাহীর ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে দুই গবেষণা গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসব

পাঁচ হাজার বছর আগের ইতিহাস থেকে শুরু করে বাংলার ইতিহাসচর্চার এক নিবেদিতপ্রাণ পথিকৃৎ- রাজশাহীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিস্তৃত পরিসর উঠে এসেছে নতুন দুটি গবেষণাগ্রন্থে। একটিতে স্থান পেয়েছে বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের দীর্ঘ পথচলা, প্রত্ননিদর্শন ও প্রতিষ্ঠার নেপথ্যের মানুষের কথা। অন্যটিতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র জীবন, গবেষণা ও ইতিহাসচর্চার নানা অধ্যায়। একই মঞ্চে প্রকাশিত এই দুটি বই যেন রাজশাহীর অতীতকে নতুন প্রজন্মের সামনে নতুন করে তুলে ধরার প্রয়াস।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারের সেমিনার কক্ষে আয়োজিত প্রকাশনা উৎসবে বই দুটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-রেজিস্ট্রার মো. সফিকুলের লেখা বই দুটি প্রকাশ করেছে কথা প্রকাশ। গ্রন্থ দুটি হলো-‘বাংলার গৌরব বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম’ এবং ‘অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় বাংলার ইতিহাসচর্চার পথিকৃৎ’।
প্রকাশনা উৎসবে সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মো. হাসেন আলী। প্রধান আলোচক ছিলেন বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের সাবেক পরিচালক ও ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী।
বিশেষ অতিথি ছিলেন কথা প্রকাশের সত্ত্বাধিকারী জসিম উদ্দিন। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিমুল গ্রুপের চেয়ারম্যান শিমুল সরকার রনি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারের সাধারণ সম্পাদক রোটারিয়ান ড. গোলাম মাওলা। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বক্তব্য দেন স্থানীয় সোনার দেশ পত্রিকার সম্পাদক আকবারুল হাসান মিল্লাত। ভার্চ্যুয়ালি বক্তব্য দেন কুমার শরৎ কুমার রায়ের প্রপৌত্র অরূপ রায় এবং অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র প্রদৌহিত্র ড. অভিজিৎ গৌস্বামী।
বক্তারা বলেছেন, ইতিহাস শুধু অতীতের ঘটনাপ্রবাহের বিবরণ নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি। নিজেদের শিকড় ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার জন্য ইতিহাসের উপাদান সংরক্ষণ এবং তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রত্নঐতিহ্য এবং ইতিহাসচর্চার পথিকৃৎদের অবদান নিয়ে গবেষণা ও প্রকাশনা সেই কাজকে আরও এগিয়ে নেবে।
‘বাংলার গৌরব বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম’ বইটি ৩৪২ পৃষ্ঠার। ৩১টি অধ্যায় ও পরিশিষ্টে সাজানো এই গবেষণাগ্রন্থে বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের প্রত্ননিদর্শন, বিভিন্ন গ্যালারির পরিচিতি, প্রতিষ্ঠাতাদের জীবন এবং প্রতিষ্ঠানটির বিস্তারিত ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের বর্ণনায়, মিউজিয়ামটিতে রয়েছে প্রায় ১৮ হাজার বহুমাত্রিক প্রত্ননিদর্শন। এসব নিদর্শনের মধ্য দিয়ে আবহমান বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যের নানা অধ্যায় সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে সিন্ধু সভ্যতার প্রায় তিন শত প্রত্ননিদর্শনও রয়েছে।
অন্যদিকে ৫৫০ পৃষ্ঠার ‘অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় বাংলার ইতিহাসচর্চার পথিকৃৎ’ গ্রন্থটি সাজানো হয়েছে ১৬টি অধ্যায় ও পরিশিষ্টে। এতে ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র জীবন, গবেষণা ও ইতিহাসচর্চার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। বাংলার ইতিহাসকে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে চর্চার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা, পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার খননে তাঁর উদ্যোগ এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্কও গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছে।
রাজশাহীর মাটি, প্রত্ননিদর্শন, ইতিহাসচর্চা ও মনীষীদের অবদান নিয়ে প্রকাশিত এই দুই গ্রন্থ তাই শুধু দুটি নতুন বইয়ের সংযোজন নয়; বরং অতীতের সঙ্গে বর্তমানের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সংযোগ তৈরির প্রয়াস। ইতিহাসের বিস্মৃত বা ছড়িয়ে থাকা উপাদানগুলোকে গবেষণার মাধ্যমে একত্র করে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগ রাজশাহীর ঐতিহ্যচর্চায় নতুন আলোচনারও সূত্রপাত করতে পারে।



