মামলা আতঙ্ক আর জীবিকা সংকটে উপকূলের বনজীবীরা

সুন্দরবনের দুয়ার বন্ধ হতে আর মাত্র দুই দিন বাকি। ঠিক এ সময়েই সাতক্ষীরার উপকূল জুড়ে নেমে এসেছে শোক, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার ঘন অন্ধকার। বনবিভাগকর্মীদের ছোড়া গুলিতে জেলে আমিনুর রহমান গাজীর মৃত্যুর ঘটনায় একদিকে স্বজন হারানোর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে বনজীবী পল্লীগুলো, অন্যদিকে পাল্টাপাল্টি মামলা ও অজ্ঞাত আসামির তালিকায় গ্রেপ্তার আতঙ্কে ঘরছাড়া অনেকেই।
গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, পদ্মপুকুরসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন জেলেপাড়ায় এখন রাত নামলেই বাড়ছে উৎকণ্ঠা। অনেক পরিবারে পুরুষ সদস্যরা বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে থাকায় নারীরা সন্তানদের নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
এর মধ্যেই আগামী ১ জুন থেকে শুরু হচ্ছে সুন্দরবনে টানা তিন মাসের বার্ষিক নিষেধাজ্ঞা। এ সময় বন থেকে মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য সম্পদ আহরণ পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। ফলে বছরের সবচেয়ে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বননির্ভর হাজারো পরিবার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিকল্প কর্মসংস্থান বা পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা ছাড়া প্রতি বছরের মতো এবারও উপকূলের বনজীবীদের জন্য অপেক্ষা করছে দীর্ঘ অভাব-অনটনের সময়। সব মিলিয়ে স্বজন হারানোর বেদনা, মামলার ভয় এবং সামনে জীবিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় সুন্দরবনপাড়ের জনপদগুলোতে এখন বইছে বুকভাঙা হাহাকার।
গত ১৮ মে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের আওতাধীন পাটকোষ্টা এলাকার একটি খালে মাছ ও কাঁকড়া ধরার সময় বনরক্ষীদের গুলিতে নিহত হন আমিনুর গাজী। এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ বনজীবীরা বনবিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয় ও বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন অফিসে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এতে পাঁচজন বনরক্ষী আহত হন বলে বনবিভাগ দাবি করেছে।
পাল্টাপাল্টি মামলা, আতঙ্কে জেলেপাড়া
ঘটনার পর খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনাস্থল কয়রা থানা এলাকায় হওয়ায় নিহত জেলের ভাতিজা অলিউল্যাহ বাদী হয়ে কয়রা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় বনবিভাগের নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা মোবারক হোসেন, পশ্চিম বনবিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক শামীম রেজাসহ অজ্ঞাত ৯ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
অন্যদিকে সরকারি কাজে বাধা ও বনরক্ষীদের ওপর হামলার অভিযোগে বনবিভাগের শরবতখালী টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোক্তাদির রহমান বনজীবীদের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেন। এ ছাড়া সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় ২৩ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ৩০০ থেকে ৩৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলার পর থেকেই উপকূলের বিভিন্ন জেলেপাড়ায় পুরুষশূন্য অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।
নিষেধাজ্ঞা ঘিরে বাড়ছে হতাশা
আগামী ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনের সব নদী ও খালে মাছ-কাঁকড়া আহরণ এবং পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে। এ পরিস্থিতিতে গাবুরার বনজীবী সাইফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানালেন, প্রতি বছর নিষেধাজ্ঞার তিন মাস ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়। সরকার যে সামান্য চাল সহায়তা দেয়, তা দিয়ে কয়েক দিনও চলে না। এবার নিষেধাজ্ঞার আগেই একজন জেলেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, আবার শত শত মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। এখন গ্রামে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
একই এলাকার বনজীবী কামরুল হোসেন মন্তব্য করেন, তারা পেটের দায়ে বনে যান, কোনো অপরাধ করতে নয়। তার ভাষ্য, সামান্য মাছ ধরার জন্য যদি গুলি করে মানুষ মারা হয়, আর হাজার হাজার জেলের নামে মামলা হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব?
স্থানীয়দের দাবি, সামনে তিন মাস আয় বন্ধ থাকায় অধিকাংশ বনজীবী পরিবার এখন চরম অর্থকষ্টে পড়েছে।
নিষেধাজ্ঞার পেছনের কারণ
বনবিভাগ সূত্র জানায়, জুন থেকে আগস্ট, এই তিন মাস সুন্দরবনের নদী ও খালে প্রায় ৮৩ শতাংশ মাছ ডিম ছাড়ে। ফলে মৎস্যসম্পদ ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রতি বছর ৯০ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। ২০১৯ সাল থেকে পুরো সুন্দরবনে এই নিয়ম চালু রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ সময়ের এই নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকায় বনজীবী পরিবারগুলো প্রতি বছর বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে।
প্রশাসন ও বনবিভাগের বক্তব্য
কয়রা থানার ওসি মো. শাহ আলম জানালেন, ঘটনাস্থল কয়রা থানার আওতাধীন হওয়ায় নিহত জেলের স্বজনরা সেখানে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। পাশাপাশি বনবিভাগের পক্ষ থেকেও সরকারি কাজে বাধা ও হামলার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মশিউর রহমান দাবি করেছেন, জেলের মৃত্যুর ঘটনা খুলনা রেঞ্জ এলাকায় ঘটলেও হামলা চালানো হয়েছে সাতক্ষীরা রেঞ্জ কার্যালয়ে। হামলাকারীরা রেঞ্জ অফিসে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে এবং বনকর্মীদের মারধর করেছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তার মতে, ঘটনার পেছনে বড় ধরনের ষড়যন্ত্র থাকতে পারে।
সুন্দরবন পশ্চিম বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান জানালেন, জেলে নিহতের ঘটনা তদন্তে দুটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলেই প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বনবিভাগের দাবি, হামলাকারীরা রেঞ্জ কার্যালয়ের মূল ফটক, সিসি ক্যামেরা, গেট, গ্রিল, থাই গ্লাস, এসি ও সরকারি আসবাবপত্র ভাঙচুর করেছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নষ্ট ও মালামাল লুট করা হয়েছে। এতে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি এবং ৪ লাখ টাকার মালামাল লুট হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
শ্যামনগর থানার ওসি খালেদুর রহমান জানালেন, মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে এবং আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।






