পাইকগাছা
শঙ্খধ্বনি আর ঢাকের গর্জনে মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীবরণ

কাসর-ঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি আর ঢাকের গর্জনে মুখর হয়ে উঠেছে উপকূলীয় জনপদ খুলনার পাইকগাছা। মণ্ডপে মণ্ডপে দুর্গাদেবীর আরাধনা, বর্ণিল আলোকসজ্জা আর ভক্ত-দর্শনার্থীদের পদচারণায় শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।
আজ ষষ্ঠীপূজাকে ঘিরে উপজেলার ১৫১টি পূজামণ্ডপে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। নতুন পোশাক কেনাকাটা, বাজারে ক্রেতাদের আনাগোনা এবং শিশুদের উচ্ছ্বাসে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে জনপদজুড়ে। ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধনে একাকার হচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
অন্যদিকে, উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা।
মণ্ডপে মণ্ডপে উৎসবের আমেজ
ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ায় সকাল থেকেই বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আনাগোনা দেখা গেছে। প্রতিমার নান্দনিক রূপ, মণ্ডপের সাজসজ্জা এবং ঢাকের বাদ্য উৎসবের পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা, পরিচিতজনদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন অনেকে।
স্থানীয় বাসিন্দা প্রসেনজিৎ মণ্ডল বলেছেন, দুর্গাপূজা তাদের কাছে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ারও উপলক্ষ। ঢাকের আওয়াজ, শঙ্খধ্বনি এবং মণ্ডপের আলোকসজ্জা সব মিলিয়ে এই সময়ে পুরো এলাকায় আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়।
১৫১ মণ্ডপে দুর্গোৎসব
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ পাইকগাছা উপজেলা শাখার তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় এবার মোট ১৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে পৌরসভায় ৬টি, হরিঢালীতে ১৭টি, কপিলমুনিতে ১৮টি, লতায় ১২টি, দেলুটিতে ১৩টি, সোলাদানায় ১২টি, লস্করে ১৯টি, গদাইপুরে ৭টি, রাড়ুলীতে ২০টি, চাঁদখালীতে ১৫টি এবং গড়ইখালীতে ১২টি মণ্ডপ রয়েছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ পাইকগাছা উপজেলা শাখার আহ্বায়ক প্রাণকৃষ্ণ দাস জানান, দুর্গোৎসব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যেরও প্রতীক। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদযাপনের প্রত্যাশা করছেন তারা।
পরিষদের সদস্যসচিব হিমাদ্রী শেখর দে জানান, প্রতিটি মণ্ডপে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ভক্ত-দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সবার সহযোগিতায় উৎসব আনন্দমুখর ও শান্তিপূর্ণ হবে বলে আশা করছেন তারা।
নতুন পোশাক কেনাকাটায় ব্যস্ত ক্রেতারা
দুর্গোৎসবকে ঘিরে পাইকগাছা উপজেলাসহ পৌর সদরের বিভিন্ন বিপণিবিতান ও পোশাকের দোকানে বেড়েছে ক্রেতাদের আনাগোনা। পূজার আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে নতুন পোশাক, জুতা, প্রসাধনী ও শিশুদের পছন্দের বিভিন্ন সামগ্রী কিনছেন অনেকে। বিশেষ করে শিশুদের পোশাকের দোকানগুলোতে অভিভাবকদের উপস্থিতি চোখে পড়ছে। পরিবারের ছোট সদস্যদের পছন্দ অনুযায়ী পোশাক কিনতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
স্থানীয় পোশাক ব্যবসায়ী রামপ্রসাধ দাবি করেন, দুর্গাপূজা উপলক্ষে দোকানে ক্রেতাদের আনাগোনা বেড়েছে। শিশুদের পোশাকসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাকের চাহিদা রয়েছে। উৎসবকে সামনে রেখে ভালো বেচাকেনার প্রত্যাশা করছেন তারা।
সন্তানের জন্য নতুন পোশাক কিনতে আসা স্থানীয় অভিভাবক কেয়া রাণী রায় বলেন, পূজা উপলক্ষে শিশুরা নতুন পোশাকের জন্য অপেক্ষা করে। তাদের পছন্দ অনুযায়ী পোশাক কেনার চেষ্টা করছেন তিনি। পরিবারের সবাইকে নিয়ে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে চান।
নতুন পোশাকের অপেক্ষায় থাকা শিশু প্রিয়াংকা রায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে জানায়, পূজায় নতুন জামা পরে বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরবে। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা এবং আলোকসজ্জা উপভোগ করাই তার কাছে উৎসবের সবচেয়ে আনন্দের বিষয়।
ক্রেতাদের অনেকে জানান, পরিবারের সদস্যদের জন্য পোশাক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে বাজারে এসেছেন তারা। কেনাকাটার এই ব্যস্ততা উৎসবের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
নিরাপত্তায় প্রশাসনের নজরদারি
দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে পাইকগাছা উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পূজামণ্ডপের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সতর্ক রয়েছে।
পাইকগাছা থানার ওসি শেখ আব্দুল আওয়াল কবির সতর্ক করেন, দুর্গোৎসব ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা, টহল এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করা হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী সিদ্ধান্তের কথা জানান, প্রশাসন, পূজা উদযাপন কমিটি ও স্থানীয় জনগণের সমন্বয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উৎসবের আনন্দ যেন নির্বিঘ্ন থাকে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ষষ্ঠীপূজাকে কেন্দ্র করে পাইকগাছায় শুরু হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দঘন পরিবেশ। মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর আরাধনা, বাজারে কেনাকাটার ব্যস্ততা এবং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবারের দুর্গোৎসব সম্পন্ন হবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।



