ওবায়দুল কাদের ও কাদের মির্জার বাড়ি
ক্ষমতার উঠানে এখন ভয়
- একসময় নিয়ন্ত্রণ হতো নোয়াখালীর রাজনীতি
- ২০২৪ ও ২০২৫ সালে দুই দফা হামলা
- এখন পোড়া ও ভগ্ন ফাঁকা ঘর, ভুতুড়ে নিস্তব্ধতা

একসময় নেতাকর্মীদের আনাগোনায় মুখর থাকত বাড়িটি। সকাল থেকে সন্ধ্যা গড়াত রাজনৈতিক আলোচনায় ও কোলাহলে। কিন্তু সেটি যেন আজ শুধুই ধ্বংসস্তূপ। দেখে যেন মনে হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো এলাকা। বাড়ির উঠানে নেই কোনো জনমানব। বারান্দায় নেই কোনো সাড়াশব্দ। ফটকের সামনে থামে না গাড়ির বহরও। চারপাশে পোড়া কালো দেয়াল, মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়া আগুনে বিবর্ণ গাড়ি। সেই গাড়িতে গজিয়েছে লতাগুল্ম। ভাঙাচোরা ফাঁকা ঘরে এখন ভুতুড়ে নিস্তব্ধতা। ‘সময় কত দ্রুত পাল্টে যায়। আহ! রাজনীতির কী নির্দয় পরিণতি!’ বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মনে মনে বলেন এলাকাবাসী। হ্যাঁ, বদলে তো গেছেই। কথা হচ্ছিল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ওবায়দুল কাদের ও তার ছোট ভাই কাদের মির্জার বাড়ি নিয়ে। পরিবারের সদস্যরা তো বটেই, জেলাবাসীও কোনো দিন কল্পনা করতে পারেননি দুর্দান্ত প্রভাবশালী পরিবারের বাড়িটি আজ এই দশা হবে।
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বড় রাজাপুর গ্রামের ‘ফজলুল হক মিয়ার বাড়ি’। এ বাড়িতেই জন্ম কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের। তার সঙ্গে এক বাড়িতেই বেড়ে ওঠেন পরিবারে আরও ১০ ভাইবোন। রাজনীতির উত্থানের পর বাড়িটি পরিচিতি পায় ‘ওবায়দুল কাদেরের বাড়ি’ নামে।
একসময় বাড়িটির সামনে দিন-রাত সরকারি আমলা, ঠিকাদার, নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ওবায়দুল কাদের এলে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়তেন তার বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করতে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতেন নেতাকে একবার দেখার আশায়। নির্বাচনের সময় বাড়িটি হয়ে উঠত ‘নোয়াখালী রাজনীতির নিয়ন্ত্রক’। স্থানীয় অনেকের কাছে এটি ছিল ক্ষমতা, প্রভাব আর রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক।
কেউ কল্পনাও করতে পারেননি দুর্দান্ত প্রভাবশালী পরিবারের আজ এই দশা হবে
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে পাল্টে যায় সবকিছু। দুই দফায় হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে বাড়িটিতে। এরপর থেকেই সেটি প্রায় জনশূন্য। বাড়ির আঙিনায় বাস করেন ওবায়দুল কাদেরের দুই চাচাতো ভাই সেলিম, তানভীর ও ভাতিজা আজাদের পরিবার। হামলার পর থেকে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন তারা। সন্ধ্যা নামলেই পুরো বাড়িতে নেমে আসে ভয়ার্ত আবহ।
ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বসুরহাট পৌরসভার সাবেক মেয়র আবদুল কাদের মির্জা থাকতেন এ বাড়িতেই। সেখানকার অন্য একটি ভবনে বাস করতেন পরিবারের আরেক সদস্য শাহাদাত মিয়াও। তাদের ঘিরে চলত স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড। নেতাকর্মীর ভিড়ের বদলে এখন সেখানে শুধুই সুনসান নীরবতা।
বাড়িটির কথা তুলে ধরেন প্রবীণ বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন। তার দেওয়া তথ্য, ১১ ছেলেমেয়ে নিয়ে আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন কাদেরের বাবা মোশাররফ হোসেন। কাদের পরিবারের শুরুর জীবনটা ছিল খুবই সাদামাটা। একসময় সেখানে ছিল দুটি চারচালা টিনের ঘর। পরে রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় বাড়িটিও। কাদের মির্জা গড়ে তোলেন একতলা ভবন। তবে আলাদা কোনো ঘর ছিল না ওবায়দুল কাদেরের। এলাকায় এলে থাকতেন ছোট ভাইয়ের বাড়িতেই। ২৬ বছরে সেখানে খুব কমই রাত কাটিয়েছেন তিনি। কাদেরের ভাতিজাবউ সুরাইয়া বেগমের চোখ থেকে যেন এখনো শঙ্কা কাটেনি। নিচু স্বরে বললেন, ‘গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসেও বাড়িতে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করা হয়। ঘরের পাশে পুলিশ পাহারা থাকত। রাতে কোনো রকম দরজা দিয়ে ঘুমিয়ে থাকতাম। অজানা এক ভয় কাজ করে। দিনের বেলায় অচেনা মানুষ আসেন বাড়িটি দেখতে। কেউ ছবি তোলেন, কেউ ভিডিও করেন। আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মী এখন আর এই বাড়িতে আসেন না।’
বাড়ি ঘিরে কাদেরের ছোটবোন রোকেয়া বেগমের কণ্ঠে গভীর আবেগ। কাঁদো কাঁদো স্বরে বললেন, ‘৫ আগস্টের পর দুবার বাবার বাড়ি দেখতে গিয়েছি। কষ্টে বুকটা ভেঙে গেছে। এটা শুধু ওবায়দুল কাদের বা মির্জা কাদেরের বাড়ি নয়; এটা আমাদের শিকড়। এখানেই জড়িয়ে আছে আমাদের বাবা-মায়ের স্মৃতি।’
সেদিনের সেই হামলার বিবরণ তুলে ধরেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মাহমুদুর রহমান রিপন। বললেন, ‘৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সাধারণ মানুষ বসুরহাট বাজার থেকে মিছিল নিয়ে ওবায়দুল কাদেরের বাড়ির দিকে যান। একপর্যায়ে বাড়িঘরে ভাঙচুর চালান। পরে দ্বিতীয় দফায় শহরের মাইজদী থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা ঘোষণা দিয়ে সেখানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। ঘটনার পর আমরা ওই বাড়িতে আর যাইনি, কোনো খোঁজখবরও নিইনি।’




