লোনা মাটির বুকে মিষ্টি স্বপ্নের বাগান

ছবি: আগামীর সময়
একসময় প্রচলিত লোকবিশ্বাস ছিল, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের লোনা বাতাস আর উপকূলীয় পলি-মাটিতে ভালো আম চাষ সম্ভব নয়। আম মানেই ছিল উত্তরবঙ্গের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের একচ্ছত্র আধিপত্য। কিন্তু সেই চিরাচরিত ধারণাকে সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বরগুনার বেতাগী উপজেলার বিবিচিনি ইউনিয়নের দেশান্তরকাঠি গ্রামের এক স্কুল শিক্ষক মো. মাহবুবুর রহমান। পেশায় তিনি মধ্য দেশান্তরকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তার হাতের নিবিড় পরিচর্যায় উপকূলের মাটি আজ যেন সোনা ফলাচ্ছে। আর গাছের ডালে ডালে সুবিন্যস্তভাবে ঝুলছে মিষ্টি আমের থোকা।
পরম তৃপ্তির হাসি মুখে মাহবুবুর রহমান বললেন, ‘আম চাষ করতে জানলে সবই সম্ভব। সদিচ্ছা আর শ্রম থাকলে আমাদের এই মাটি যে সোনার চেয়েও খাঁটি, তা প্রমাণ করা যায়।’
পেশায় শিক্ষক হলেও মাটির প্রতি তার আজন্ম টান ও নিছক শখ থেকেই একদিন বাড়ির আঙিনায় কয়েকটি আমগাছ রোপণ করেছিলেন। সময়ের পরিক্রমায় সেই শখই আজ বিশাল এক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ১২০ শতাংশ জমির ওপর ২০১০ সালে গড়ে তোলা সেই ছোট্ট বাগানটি আজ একটি বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রকল্পে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে প্রতি বছর তার একাধিক বাগান থেকে শত শত মণ আম উৎপাদিত হচ্ছে। আম চাষে সঠিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের জন্য তিনি আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে গিয়ে হাতে-কলমে বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরপর থেকে শিক্ষকতার পাশাপাশি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রোগবালাই দমন ও সঠিক সময়ে সার প্রয়োগসহ বাগানের প্রতিটি কাজ তিনি নিজেই তদারকি করে আসছেন।
শিক্ষক মাহবুবুর রহমানের বাড়ির চারপাশে এখন উন্নত জাতের সুস্বাদু আমের এক জীবন্ত প্রদর্শনী। তার বাগানে গোপালভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, হাড়ি ভাঙা, বারি-৪, আশ্বিনা ও ফজলীর পাশাপাশি ব্যানানা, কিং অব চাকাপাত, ব্রেড আইভরি, গৌড়মতি, কিউ জাই এবং আলফনসোর মতো হরেক রকমের আম থোকায় থোকায় ঝুলছে।
সম্পূর্ণ রাসায়নিক ও ক্ষতিকর কেমিক্যালমুক্ত হওয়ায় এই আমের স্বাদ বাজারের সাধারণ আমের তুলনায় অনেক বেশি সুস্বাদু। এই অনন্য স্বাদের কারণে ক্রেতাদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। বাগানজুড়ে এখন এক উৎসবমুখর পরিবেশ—কেউ গাছ থেকে আম পাড়ছেন, কেউ পরম যত্নে প্যাকেটজাত করছেন, আবার দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতারা ভিড় করছেন আম কেনার জন্য।
সম্পূর্ণ বিষমুক্ত হওয়ায় আম বিক্রির জন্য মাহবুবুর রহমানকে বাজারে যেতে হয় না; ক্রেতারাই সরাসরি তার বাগান কিংবা বাড়িতে এসে আম কিনে নিয়ে যান। বর্তমানে তার বাগানের আম প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ঢাকার বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানেও এই আম সরবরাহ করা হচ্ছে। শখের বশে শুরু করা এই উদ্যোগ আজ তাকে এলাকার একজন সফল ও আদর্শ আমচাষি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বাস্তবতা হলো, দেশের মূলধারার গণমাধ্যমে আম চাষের যেসব খবর প্রকাশিত হয়, তার অধিকাংশই নির্দিষ্ট কিছু ভৌগোলিক অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু উপকূলীয় এই বেতাগীর পলিযুক্ত মাটি যে সঠিক বৈজ্ঞানিক পরিচর্যায় আম চাষের জন্য এক পরম আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে, তা তিনি প্রমাণ করেছেন।
অবসর সময়কে অলসভাবে না কাটিয়ে কীভাবে উৎপাদনমুখী ও পরিবেশবান্ধব কাজে লাগানো যায়, তার অনন্য উদাহরণ মাহবুব মাস্টার। তার এই অভাবনীয় সাফল্য শুধু নিজের অর্থনৈতিক সচ্ছলতাই আনেনি, বরং পুরো এলাকায় এক ইতিবাচক পরিবর্তনের ঢেউ তুলেছে। এই সবুজ বিপ্লব দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে স্থানীয় শিক্ষক, বেকার যুবক ও সাধারণ কৃষকেরা এখন লাভজনক ফল চাষের পরামর্শ নিতে তার কাছে আসছেন এবং চারা নির্বাচন ও জৈব পরিচর্যার নানা কৌশল শিখছেন।
জাতীয় প্রেক্ষাপটে মাহবুবুর রহমানের এই উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। এটি প্রতিকূল জলবায়ু ও প্রচলিত সামাজিক ধারণাকে জয় করে স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প। উপকূলীয় জনপদে পুষ্টির চাহিদা পূরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে এমন সৃজনশীল উদ্যোগ আরও ছড়িয়ে পড়া প্রয়োজন।
এই বিষয়ে বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাদ্দাম হোসেন বলেছেন, ‘প্রধান শিক্ষক মাহবুবুর রহমান আমাদের উপজেলার গর্ব। প্রথাগত ধারণা ভেঙে উপকূলীয় লোনা আবহাওয়ায় সুস্বাদু আমের বাগান করে তিনি যে সবুজ বিপ্লব ঘটিয়েছেন, তা গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মাহবুবুর রহমানের দেখাদেখি এলাকার বেকার যুবক ও কৃষকেরা যাতে বাণিজ্যিকভাবে আম চাষে এগিয়ে আসতে পারেন। সেজন্য উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে চারা, প্রশিক্ষণসহ সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।’


