গরিবের চাল খোলা বাজারে

ছবি: আগামীর সময়
রাতের আঁধারে নয়, দিনের আলোতেই যেন গায়েব হয়ে যাচ্ছে গরিব মানুষের অধিকার। সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল পৌঁছানোর কথা ছিল হতদরিদ্র পরিবারের ঘরে, কিন্তু সেই চালই এখন মিলছে খোলা বাজারে। এমন অভিযোগে তোলপাড় গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলা।
কয়েকদিন ধরে এসংক্রান্ত একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভিডিওটি ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।
একদিকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অনেক অসহায় পরিবার অপেক্ষা করছে ১৫ টাকা কেজির চালের জন্য, অন্যদিকে সেই চালই বিক্রি হচ্ছে তিনগুণেরও বেশি দামে খোলা বাজারে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, যাদের জন্য সরকারের এ সহায়তা, তারা পাচ্ছে না। বরং মৃত আর পলাতকদের নাম ব্যবহার করে মাসের পর মাস হচ্ছে চাল আত্মসাৎ।
এলাকাবাসীর দাবি, উপকারভোগীদের তালিকায় মৃত ব্যক্তি ও এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া লোকজনের নাম বহাল রেখে প্রতি মাসে অন্তত ৭০ বস্তা চাল আত্মসাৎ করা হচ্ছে। পরে সেই চাল বিক্রি হচ্ছে বাজারে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ২৬ এপ্রিল নাগরী এলাকার একটি হাফিজিয়া মাদরাসায় সরকারি মনোগ্রামযুক্ত চালের ৪০টির বেশি বস্তা দেখতে পান কয়েকজন বাসিন্দা। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে তারা মাদরাসা সুপারের কাছে জানতে চান। পরে বেরিয়ে আসে বিস্ময়কর তথ্য।
মাদরাসার সুপার আরিফ উল্লাহ স্বীকার করেন, তিনি ডিলারের প্রতিনিধি পরিচয়দানকারী রুবেল নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে প্রতি বস্তা ১ হাজার ৫০ টাকা দরে ৪২ বস্তা চাল কিনেছেন। শুধু এবারই নয়, আগেও একাধিকবার একইভাবে সরকারি চাল কিনেছেন বলেও জানান তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাগরী এলাকার খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির নিবন্ধিত ডিলার শেফালী বেগম। তবে বাস্তবে কার্যক্রম পরিচালনা করেন তার জামাতা এস এম রুবেল হাসান। নাগরী বাজারের গুদাম থেকে প্রতি মাসে ৫৬৫ বস্তা চাল বিতরণের বরাদ্দ পান তারা।
অভিযোগ রয়েছে, তালিকাভুক্ত অন্তত ৭০ জন উপকারভোগী হয় মৃত, নয়তো বহু আগে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু তাদের নাম বাদ না দিয়ে নিয়মিত চাল উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব চাল সরাসরি খোলা বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি হিসাবে, হতদরিদ্র পরিবারগুলো বছরে ছয় মাস ১৫ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজির একটি চালের বস্তা পাওয়ার কথা। অর্থাৎ প্রতিটি বস্তার মূল্য ৪৫০ টাকা। কিন্তু সেই একই বস্তা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০ টাকায়। এতে প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত ৬০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া তালিকাভুক্ত অনেক সক্রিয় উপকারভোগীকেও চাল না দিয়ে তাদের বরাদ্দ বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
বাংলাদেশ সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি মূলত নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চালু করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় সুবিধাভোগীরা স্বল্পমূল্যে চাল পান এবং ডিলাররা প্রতি কেজিতে কমিশন পান ১৩ টাকা ৫০ পয়সা। পাশাপাশি প্রতি বস্তার জন্য আলাদা কমিশনও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডিলারের পক্ষে কার্যক্রম পরিচালনাকারী এস এম রুবেল হাসান। তিনি জানালেন, আমার বিরুদ্ধে একটি পক্ষ পরিকল্পিত অপপ্রচার চালাচ্ছে। তারা চেয়েছিল অংশীদার হয়ে কাজ করতে। আমি রাজি না হওয়ায় মিথ্যা অভিযোগ তুলছে। তারা আগে এই কর্মসূচি চালিয়ে নানা অনিয়ম করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে ভাইয়াসূতী হাফিজিয়া মাদরাসার সুপার আরিফ উল্লাহর ভাষ্য, রুবেল নামের একজনের কাছ থেকে আমি ৪২ বস্তা চাল কিনেছি। আগেও কয়েকবার একইভাবে চাল নিয়েছি। প্রতি বস্তার দাম ছিল ১ হাজার ৫০ টাকা।
কালীগঞ্জ উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা শাকিলা শারমিন জানালেন, অভিযোগের তদন্ত চলছে। তদন্তে ডিলারের সংশ্লিষ্টতা পেলে ডিলারশিপ বাতিলসহ আইনিব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও অবহিত করা হয়েছে।
বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, জানান কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের দাবি, শুধু তদন্ত নয়, প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে উপকারভোগীদের তালিকা হালনাগাদ করে প্রকৃত অসহায় মানুষের হাতে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।




