নারীর পেটে মিলল সাড়ে ৬ কেজির বিরল টিউমার

চাঁদপুরে নারীর পেট থেকে অপসারণ করা টিউমার হাতে চিকিৎসকরা— সংগৃহীত
চাঁদপুরে ৬৫ বছর বয়সী এক নারীর পেট থেকে ৬ কেজি ৪৫০ গ্রাম ওজনের ফুটবল আকৃতির বিশাল টিউমার অপসারণ করা হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, এত বড় আকৃতির টিউমার বিরল এবং এর অস্ত্রোপচার ছিল অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় মেরিন হাসপাতালে প্রায় দুই ঘণ্টার জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমারটি অপসারণ করা হয়। অস্ত্রোপচারে নেতৃত্ব দেন সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, সার্জন ও সহকারী অধ্যাপক ডা. এইচ এম হাসান ইমাম সানী। তার সঙ্গে ছিলেন জেনারেল সার্জন ও ল্যাপারোস্কোপিক কনসালটেন্ট ডা. মো. হাসান জুলকার নাইনসহ একটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল।
অস্ত্রোপচার শেষে রোগী মিলন বেগম (৬৫) বর্তমানে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। মিলন বেগম চাঁদপুর পৌরসভার শিলন্দিয়া এলাকার কাজী বাড়ির বাসিন্দা।
জানা যায়, কয়েক মাস ধরে মিলন বেগমের পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যেতে থাকে। একই সঙ্গে খাবার গ্রহণেও সমস্যা হচ্ছিল। এ অবস্থায় তিনি চাঁদপুর শহরের বিভিন্ন চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। পরে মেরিন হাসপাতালে এসে থাইরয়েড, হরমোন ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মাহমুদুল হাসানের পরামর্শ নেন। তার পরামর্শে আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হলে পেটে বড় আকৃতির ওভারিয়ান টিউমার শনাক্ত হয়।
টিউমারটির আকার অস্বাভাবিক বড় হওয়ায় পরে ইবনে সিনা মেডিকেল সেন্টারে সিটি স্ক্যান করানো হয়। সিটি স্ক্যানের প্রতিবেদনে টিউমারটির আনুমানিক ওজন প্রায় সাড়ে ৫ কেজি উল্লেখ করা হয়। এরপর ডা. মাহমুদুল হাসান রোগীকে সার্জারি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেন।
পরবর্তীতে রোগীর স্বজনরা তাকে কুমিল্লার একজন গাইনি অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। সেখানেও অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে টিউমারটির আকার বড় হওয়ায় অস্ত্রোপচারটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে চিকিৎসকরা জানান। একই সঙ্গে অপারেশনের ব্যয়ও তুলনামূলক বেশি হওয়ায় স্বজনরা চাঁদপুরে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেন।
এরপর জুলাই মাসের শেষ বৃহস্পতিবার রোগী পুনরায় চাঁদপুরের মেরিন হাসপাতালে আসেন এবং সার্জন ও সহকারী অধ্যাপক ডা. এইচ এম হাসান ইমাম সানীকে দেখান। তিনি সিটি স্ক্যানসহ রোগীর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট পর্যালোচনা করে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন এবং একটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল গঠন করেন।
আজ শনিবার অস্ত্রোপচার দলে আরও ছিলেন জেনারেল সার্জন ও ল্যাপারোস্কোপিক কনসালটেন্ট ডা. মো. হাসান জুলকার নাইন, এনেস্থেশিয়া কনসালটেন্ট ডা. আরিফুর রহমান কিরণ, মেডিসিন, ডায়াবেটিস ও থাইরয়েড বিশেষজ্ঞ ডা. সাইফ জামান এবং মেরিন হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. মনিষা জামান মীমসহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রোগীর পেট থেকে ফুটবল আকৃতির টিউমারটি বের করা হয়। পরে ওজন করে দেখা যায়, টিউমারটির ওজন ৬ কেজি ৪৫০ গ্রাম।
অস্ত্রোপচারের বিষয়ে ডা. এইচ এম হাসান ইমাম সানী বলেছেন, ‘চিকিৎসক হয়েছি মহান আল্লাহর দয়ায়। এত বড় আকারের টিউমার আসলে বিরল। রোগী একজন বৃদ্ধ মা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কষ্ট পাচ্ছিলেন। এ ধরনের অপারেশন অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও মানবিক দিক বিবেচনা করে আমরা সার্জারি করার সিদ্ধান্ত নিই।’
জেনারেল সার্জন ও ল্যাপারোস্কোপিক কনসালটেন্ট ডা. মো. হাসান জুলকার নাইন বললেন, ‘আমি শুক্রবার চাঁদপুরে চেম্বার করি। অপারেশনটি করার আগে নানান দিক চিন্তা করতে হয়েছে। সাধারণত অতিরিক্ত বড় হওয়ার কারণে টিউমারটি আশপাশের রক্তনালী, কিডনি, অন্ত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং সেগুলোর সঙ্গে লেগে থাকার আশঙ্কা থাকে। ফলে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল। আলহামদুলিল্লাহ, সফলভাবে অস্ত্রোপচার হয়েছে। রোগী এখন ভালো আছেন ‘
মেরিন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিহাদুল ইসলাম বললেন, ‘আমাদের মেরিন হাসপাতাল নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। আমরা ব্যবসার বিষয়টি সামনে না রেখে সেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। অনেকেই অপারেশনটি চাঁদপুরে না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু রোগীর স্বজনরা চাঁদপুরেই আমাদের হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করানোর বিষয়ে অনড় ছিলেন। এত বড় একটি জটিল অপারেশন আমাদের হাসপাতালে সফলভাবে সম্পন্ন করায় চিকিৎসক দলের প্রতি আমরা অসীম কৃতজ্ঞ।‘





