বছর ঘুরেও দুঃখ ঘোচেনি আলুচাষির
- কেজিতে খরচ ১৪ টাকা, বিক্রি ১২

ছবিঃ আগামীর সময়
আলুর উৎপাদন খরচ ১৪ টাকা। দুই টাকা লোকসান দিয়ে বিক্রি হচ্ছে ১২ টাকায়। উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিক্রি হয়েছে গত মৌসুমেও। এবারও তাই। উটকো ঝামেলা যোগ হয়েছে বস্তায়।
রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলে আলু তোলার মৌসুমে দেখা দিয়েছে তীব্র পাটের বস্তা সংকট। উৎপাদন খরচও তুলতে না পেরে বাধ্য হয়ে কৃষকরা জমিতেই পানির দামে আলু বিক্রি করছেন। প্রতি কেজিতে প্রায় দুই টাকা করে ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষক।
জ্বালানি সংকটের অজুহাতে পরিবহন ব্যাহত, আর বস্তা সংকটকে ঘিরে সিন্ডিকেটের অভিযোগ—সব মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও লোকসানের মুখে পড়েছেন হাজারো আলুচাষি। রাজশাহী, বগুড়া, নওগাঁ, জয়পুরহাট ও রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের প্রধান আলু উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে পুরোদমে চলছে আলু উত্তোলন। কিন্তু এই মৌসুমেই চাষিদের সামনে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে পাটের বস্তার অভাব। ফলে বাজারে আলুর দাম কমে গিয়ে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছেন চাষিরা।
চাষিদের অভিযোগ— বস্তা সংকটের অজুহাতে বড় মজুত ব্যবসায়ীরা সরাসরি জমি থেকে আলু কেনা বন্ধ রেখেছেন। তবে ফড়িয়া ও দালালদের মাধ্যমে তারা কম দামে আলু কিনছেন। এতে কৃষকেরা বাধ্য হয়ে উৎপাদন খরচের নিচেই আলু বিক্রি করছেন। গত সপ্তাহেও জমিতে নতুন আলুর দাম ছিল ১৫ থেকে ১৬ টাকা কেজি। কিন্তু বর্তমানে তা নেমে এসেছে ১২ থেকে ১৩ টাকায়। অথচ প্রতি কেজি আলু উৎপাদন খরচ পড়েছে ১৩ থেকে ১৪ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে হিমাগার ভাড়া (প্রতি কেজি প্রায় ৮ টাকা) ও পরিবহন ব্যয়। ফলে চাষিরা চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন। এদিকে বস্তার দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
এ দিকে গতবছর আলু উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ পর্যন্ত প্রতি কেজিতে খরচ পড়েছিল ২৪-২৫ টাকা। সরকার হিমাগার গেটে প্রতি কেজি আলুর দাম ২২ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। তবে সেই দরে কোনো আলু বিক্রিহয়নি। প্রতি কেজি আলু ৯-১০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল। এতে প্রতি কেজিতে ১৬ টাকা পর্যন্ত লোকসান হয়েছিল কৃষকের। এছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে টিসিবি পণ্য হিসেবে আলু ক্রয় করার পরিকল্পনা ছিল কিন্তু সেই পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেনি। এটি বাস্তবায়ন হলে কিছুটা কৃষকের লোকসান ঘুচিয়ে যেত বলে ধারণা করা হয়।
গত বছর যে বস্তা ৭০-৮০ টাকায় পাওয়া যেত, এবার সেটি কিনতে হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৯৫ টাকায়। অনেক ক্ষেত্রে অর্ডার দেওয়ার পরও ১০ দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
চাষিদের অভিযোগ, হিমাগার মালিক, জুট মিল মালিক ও মৌসুমী মজুদ ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট কৃত্রিমভাবে বস্তা সংকট তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে কম দামে আলু কিনে বেশি দামে বিক্রির সুযোগ নিচ্ছে তারা।
‘গত বছর বড় ধরনের লোকসান গুনেছি। এবার কিছুটা লাভের আশায় আলু চাষ করলেও বস্তা সংকটে সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। আলু তুলে জমিতে ফেলে রাখতে হচ্ছে। বৃষ্টি হলে সব পচে যাবে। যে দামে বিক্রি করছি, তাতে খরচও উঠছে না’—বলছিলেন রাজশাহীর তানোর উপজেলার চাষি লুৎফর রহমান।
নওগাঁর মান্দা উপজেলার চাষি গোলাম মোস্তফা ও নবাব আলী জানালেন, প্রতি বছর তারা বগুড়া থেকে বস্তা কিনে আনতেন। কিন্তু এবার জ্বালানি সংকটে পরিবহন পাওয়া যাচ্ছে না। যেসব গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর ভাড়া দুই থেকে তিনগুণ বেশি।
তাদের ভাষ্য, ‘চাষিদের অসহায় অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে একটি চক্র।’
‘আগে হিমাগার মালিকরাই বস্তা সরবরাহ করতেন। কিন্তু এবার তারা কোনো বস্তা দিচ্ছেন না। বরং মিল গেটেই দালালদের মাধ্যমে বেশি দামে বস্তা বিক্রি হচ্ছে’— জানালেন বাগমারা উপজেলার চাষি মনসুর রহমান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীতে প্রায় ৩৬টি হিমাগারে গড়ে ৬ লাখ বস্তা করে আলু সংরক্ষণ করা যায়। সে হিসাবে জেলায় প্রয়োজন প্রায় ২ কোটি ১৬ লাখ বস্তা। অথচ স্থানীয় জুট মিলগুলোর মোট উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় দেড় কোটি বস্তা। বাকি বস্তা আসে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে। কিন্তু জ্বালানি সংকটে সেই সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেছেন, ‘বস্তা সংকট কিছু জায়গায় রয়েছে। এটি মূলত প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক সমস্যা। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলে চাষিরা উপকৃত হবেন।’
‘জ্বালানি সংকটের কারণেই বস্তা সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। কোনো সিন্ডিকেট কাজ করছে না’—মনে করেন হিমাগার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান।
তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। মাঠে পড়ে থাকা আলু, ক্রমবর্ধমান লোকসান আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন চাষিরা। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে হাজারো আলু চাষির জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

