আগামীর সময়

পারস্পরিক বদলিতে আশাবাদ, বাস্তবে জট এখনো বহাল

পারস্পরিক বদলিতে আশাবাদ, বাস্তবে জট এখনো বহাল

স্ক্রিনশট

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের পারস্পরিক বদলি জট নিরসনে ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকে প্রাথমিক শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আইপিইএমআইএসে পারস্পরিক বদলি অপশন যুক্ত করা হয়েছে। এতে করে পারস্পরিক বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকরা নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।

তবে দীর্ঘদিন দুর্গম ও নিজ ঠিকানা থেকে দূরে থাকা বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা খুবই হতাশায় দিন পার করছেন। তাদের দাবি নতুন শিক্ষক পদায়নের আগে প্রতিস্থাপনসহ সকল বদলি সমস্যার সমাধান করা হোক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের পদায়নের আগেই বিদ্যমান শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিস্থাপন সাপেক্ষে বদলি আদেশ পাওয়া শিক্ষকদের অবমুক্ত করার বিষয়েও চূড়ান্ত আলোচনা চলছে। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয় অবগত, যদিও কার্যক্রম শুরুর নির্দিষ্ট সময় এখনো জানানো হয়নি।

‘২০২৩ সাল থেকে চেষ্টা করেও আমি আমার স্বামীর কর্মস্থলে বদলি হতে পারছি না। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে কর্মস্থলে বদলি খোলা হয়নি। আমার ছোট বাচ্চা নিয়ে সিলেট আসা-যাওয়া করতে হয়। যদি বদলির সুযোগ দেওয়া হয়, এতে সবার জন্য অনেক সুবিধা হবে’, বলছিলেন সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার শিক্ষক রুমা রানী দাস।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রতিস্থাপন সাপেক্ষে বদলি আদেশ পাওয়া শিক্ষকের সংখ্যা ৭ হাজার ৯৫ জন। এদের মধ্যে কিছুসংখ্যক শিক্ষক বদলি করা কর্মস্থলে যোগদান করতে পারলেও অধিকাংশ শিক্ষক এখনো ছাড়পত্রের অপেক্ষায়। ফলে অনেক শিক্ষক বছরের পর বছর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় দুর্গম চর, হাওর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত। বিশেষ করে নারী শিক্ষকদের একটি বড় অংশ পারিবারিক কারণে বদলি আদেশ পেলেও বাস্তবে কর্মস্থল পরিবর্তন করতে পারছেন না।

‘গত ১৭ বছর ধরে একই বিদ্যালয়ে কাজ করছি। আমি ঢাকা থেকে প্রতিদিন মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর থানায় যাতায়াত করি। আমার বাচ্চা ছোট হওয়ায় তাকে দেখার কেউ নেই, তাই তাকে বুয়ার কাছে রেখে যেতে হয়। প্রতিদিন যাতায়াতের কারণে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছি, শারীরিক সমস্যা, পায়ে হাঁটু ও গোড়ালিতে ব্যথা বেড়ে গেছে। আমি চাই বাচ্চা নিয়ে স্কুলের সামনে বাসায় থাকতে, কিন্তু সেখানে আমার কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই। ঠিকানার আশপাশে বদলি হওয়া জরুরি’, ভোগান্তির কথা জানাচ্ছিলেন মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর থানার শিক্ষক ফারিয়া ফরাস মৌটুসী।

অপর শিক্ষক ইয়াসমিন আক্তার প্রতিদিন তিনটি গাড়ি পাল্টে স্কুলে যান। তার ভাষ্য, ‘আমি ২০১৭ সালের মার্চ মাসে বিদ্যালয়ে যোগদান করি। বাসা থেকে স্কুল প্রায় ১৫–২০ কিলোমিটার দূরে। প্রতিদিন তিনটি গাড়ি পাল্টে যেতে হয়, অনেক সময় গাড়ি না থাকলে হেঁটে যেতে হয়। বর্ষাকালে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। দীর্ঘ ৯ বছর একই বিদ্যালয়ে কাজ করছি, নিজের ইউনিয়নে সুযোগ থাকলেও অন্য এলাকায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। খুবই হতাশা অনুভব করছি। বদলির আদেশ আছে কিন্তু শিক্ষক সংকটে মুক্তি পাচ্ছি না। নতুন শিক্ষক পদায়নের আগেই মুক্তি চাই।’

ভুক্তভোগী শিক্ষকরা জানাচ্ছেন, সাম্প্রতিক বড় নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হলেও এখনো নতুন শিক্ষকদের পদায়ন সম্পন্ন হয়নি। পুরাতন শিক্ষকদের বদলি সমস্যা সমাধান না করে শিক্ষক পদায়ন হলে সেটা দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করবে। প্রতিস্থাপক পদে শিক্ষক পদায়ন নিশ্চিত না হলে বদলির আদেশও কার্যকর হবে না। ফলে বদলির আদেশ থাকা সত্ত্বেও আগের কর্মস্থলেই থেকে যেতে হচ্ছে। এখন বদলি হতে না পারলে আদেশগুলোও বাতিল হবে। সদ্য নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের তাদের বিপরীতে পদায়নের দাবি জানান তারা।

এ বিষয়টি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নজরে রয়েছে বলে একাধিকবার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান। ‘বদলি আদেশ থাকা সত্ত্বেও যারা প্রতিস্থাপকের অভাবে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কর্মরত আছেন, তাদের বিষয়টি অধিদপ্তরের নজরে রয়েছে। শিক্ষক সংকট সৃষ্টি না করে কীভাবে দ্রুত তাদের অবমুক্ত করা যায়, সে বিষয়ে কাজ চলছে এবং পদায়নের আগেই সমাধান করা হবে’, মন্তব্য করেন তিনি।

উল্লেখ্য, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের ফলাফল ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রাতে প্রকাশ করা হয়। এতে চূড়ান্তভাবে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থী নিয়োগের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন, যারা বর্তমানে পদায়নের অপেক্ষায়।

    শেয়ার করুন: