যশোরের জগদীশপুর তুলা খামারের খবর রাখে না কেউ
- পলেস্তারা খসে পড়ছে প্রশাসনিক ভবনের ছাদের
- ব্যবহার অনুপযোগী আবাসিক ভবন ও অতিথিশালা
- ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার পরও কাজ করছেন কর্মীরা

এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম তুলা গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও বীজ বর্ধন খামার হিসেবে পরিচিত যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর তুলা খামার। ১৫৭ একর জমির এই খামারে প্রতি মৌসুমে উৎপাদিত হয় কোটি কোটি টাকার তুলা ও বীজ। তবে দীর্ঘদিনের জনবল সংকট, জরাজীর্ণ অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির অচলাবস্থায় ব্যাহত হচ্ছে খামারটির কার্যক্রম। অথচ কৃষি গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার বড় সম্ভাবনা রয়েছে খামারটিকে ঘিরে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খামারের বিভিন্ন ভবন ও স্থাপনার অবস্থা নাজুক। প্রশাসনিক ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে আবাসিক ভবন ও অতিথিশালাগুলোও। ২০২০ সালে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা জিনিং ও বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ শাখার ভবনেই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন কর্মীরা। ওই ভবনের ডিলেন্টিং মেশিনটিও দীর্ঘদিন ধরে অচল।
খামার সূত্রে জানা গেছে, ৬৩ দশমিক ৭০ হেক্টর বা প্রায় ১৫৭ একর জমির এই খামারটি ১৯৮০ সালের ২০ নভেম্বর উদ্বোধন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশ সরকার ও তৎকালীন ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায়ের (ইইসি) আর্থিক সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয় খামারটি।
খামারে প্রতি মৌসুমে গড়ে ৬০-৭০ টন তুলা উৎপাদিত হয়। বর্তমান বাজারমূল্যে যার দাম প্রায় ৬ কোটি ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা। উৎপাদিত তুলা সরকারি দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করা হয় বাংলাদেশ কটন অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএ) কাছে। এ ছাড়া প্রতি বছর উৎপাদিত হয় ২৫-৩০ টন তুলাবীজ। সাধারণ বীজ সরকার নির্ধারিত কেজিপ্রতি ২২ এবং উচ্চফলনশীল হাইব্রিড বীজ কেজিপ্রতি ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়।
এদিকে খামারটিতে অনুমোদিত ২৮টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন মাত্র আটজন। বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বদলি হয়ে যাওয়ায় গবেষণা কার্যক্রমেও তৈরি হয়েছে সংকট। নিরাপত্তার জন্য অনুমোদিত ২৬ জন আনসার সদস্যের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ছয়জন।
খামারের সেচ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাতেও সমস্যা রয়েছে। যান্ত্রিক ফোরম্যান না থাকায় ছোটখাটো ত্রুটি মেরামত না হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ যানবাহন ও যন্ত্রপাতি পড়ে আছে। চারটি ট্রাক্টরের দুটি এবং ছয়টি পাওয়ার টিলারের তিনটি বর্তমানে সচল।
খামারের জমিতে সিবি-১২ থেকে সিবি-১৯ এবং সিবি হাইব্রিড-১-সহ চাষ হচ্ছে আট জাতের তুলা। হাইব্রিড তুলার ফলন বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ১৭ মণ। তবে তুলা দীর্ঘমেয়াদি ফসল হওয়ায় এবং উপযুক্ত মাটির অভাবে এ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকদের অনেকেই।
খামারের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রাজিব কুমার বললেন, ‘যশোরের মাটি তুলা চাষের জন্য উপযোগী। তবে আমাদের ১৫টি ব্লকের মধ্যে ১০টিই বালিতে পূর্ণ। মাটির উন্নয়ন না করলে গবেষণার কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়।’
তবে এই খামারকে ঘিরে জীবিকার সুযোগও তৈরি হয়েছে স্থানীয় মানুষের। তুলা ও অন্যান্য ফসলের মৌসুমে এখানে দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন অনেক দরিদ্র নারী। মির্জাপুর গ্রামের হালিমা বেগম বললেন, ‘তুলার মৌসুমে তুলা তুলি। অন্য সময় কচু, বাদামসহ বিভিন্ন ফসলের কাজ করি। প্রতিদিন ৫০০ টাকা মজুরি পাই। আমার মতো অনেক অসহায় নারী এই খামারে কাজ করে সংসার চালান।’
এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও খামারটির অবকাঠামো ও জনবল সংকট কাটছে না। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মসলেহ উদ্দিন ফরিদ জগদীশপুর তুলা খামারকে কেন্দ্র করে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন।
স্থানীয়দের মতে, গবেষণা, তুলাবীজ উৎপাদন ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা গেলে এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে তার আগে খামারটির জনবল, অবকাঠামো, সেচব্যবস্থা ও যন্ত্রপাতির সংকট দূর করে কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার দাবি তাদের।






