মায়ের জন্য স্বাস্থ্যকর ফলের খোঁজ থেকেই শুভর মালবেরি চাষ

ছবিঃ আগামীর সময়
মায়ের ডায়াবেটিসজনিত সমস্যার কারণে স্বাস্থ্যকর ফলের খোঁজে স্ট্রবেরি চাষ শুরু করেন। তবে স্ট্রবেরি চাষে আশানুরূপ ফলন না পেয়ে পথ বদলান। বিকল্প হিসেবে বেছে নেন মালবেরি বা তুঁত ফলের চাষ। আর সেই সিদ্ধান্তই বদলে দিয়েছে মেহেদী হাসান শুভর ভাগ্যচক্র।
বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার আন্ধারমানিক ইউনিয়নের আজিমপুর গ্রামের বাসিন্দা শুভ চার বছর আগে ৩০ শতাংশ জমিতে গড়ে তোলেন মালবেরির বাগান। স্ত্রী কাজী নুসরাত জাহানের অনুপ্রেরণা এবং অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা বাবা সালেহউদ্দীন আকনের সহযোগিতায় শুরু হওয়া এই উদ্যোগ আজ সফলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইউটিউব থেকে চাষাবাদের কৌশল শিখে পাকিস্তানি জাতের চারা রোপণের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেন তিনি।
শুরুর পথ সহজ ছিল না। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ধীরে ধীরে গাছের সংখ্যা বাড়ান। বর্তমানে তার বাগানে রয়েছে প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি মালবেরি গাছ। প্রতিটি গাছ যেন এখন ফলছে সম্ভাবনার রঙিন গল্প। বর্তমানে বাজারে তার বাগানের মালবেরি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪০০ টাকা দরে। চলতি মৌসুমেই প্রায় ৫০ হাজার টাকার ফল বিক্রির আশা করছেন শুভ।
মেহেদী হাসান শুভ জানান, স্ট্রবেরি নিয়ে শুরুতে অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু ফলন ভালো না হওয়ায় মালবেরিতে ঝুঁকি নেই। মালবেরির গুণগত মান ধরে রাখতে হলে গাছ থেকে পাড়ার ১২ ঘণ্টার মধ্যেই তা সংরক্ষণ করা জরুরি। সঠিক তাপমাত্রা বজায় রেখে ডিপ ফ্রিজে রাখলে ফল দীর্ঘদিন ভালো থাকে এবং সহজে পরিবহনও করা যায়।
সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়েও রয়েছে শুভর নিজস্ব অভিজ্ঞতা। গাছ থেকে ফল পাড়ার পর প্রথমে হালকা করে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে একটি ট্রেতে এক স্তরে ছড়িয়ে রাখতে হয়। এরপর ফ্রিজে রেখে জমে গেলে জিপলক ব্যাগে সংরক্ষণ করলে ৬ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত তা ভালো থাকে।
শুধু অর্থনৈতিক সাফল্য নয়, শুভর মালবেরি বাগান এখন স্থানীয়দের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন আশপাশের মানুষ ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ছুটে আসছেন এই বাগান দেখতে। স্থানীয়দের বলছেন, শুভর এই উদ্যোগ বেকার যুবকদের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মালবেরি একটি পুষ্টিগুণে ভরপুর ফ্যাটবিহীন ফল। এতে রয়েছে সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম, জিঙ্কসহ ভিটামিন এ, সি, ই, বি৬, বি৩ এবং কে। প্রায় ৮৮ শতাংশ পানি সমৃদ্ধ এই ফলে রয়েছে ১ দশমিক ৪ শতাংশ প্রোটিন, ৯ দশমিক ৫ শতাংশ কার্বোহাইড্রেট এবং ১ দশমিক ৭ শতাংশ ফাইবার। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। পাশাপাশি ডায়েটরি ফাইবার হজম প্রক্রিয়া উন্নত করা, হৃদস্বাস্থ্য রক্ষা এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. নজরুল ইসলাম সিকদার বলেছেন, মালবেরি এখনো অপ্রচলিত ফল হলেও বরিশাল অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া এর চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। ব্যক্তি উদ্যোগে এ ধরনের বাগান ভবিষ্যতে সম্ভাবনাময় খাত হয়ে উঠতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, মালবেরি ফলের উৎপত্তি চীন, ভারত ও উত্তর আমেরিকায়। প্রাচীনকাল থেকেই চীন, ভারত, আফগানিস্তান এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এর চাষ হয়ে আসছে। বাংলাদেশে এটি তুঁত ফল নামে বেশি পরিচিত। সাদা মালবেরির উৎপত্তি চীনে, কালো মালবেরি পশ্চিম এশিয়ায় এবং লাল মালবেরি আমেরিকার আদি প্রজাতি।

