বগুড়ার শেরপুর
স্মার্টফোনের নেশা ছাড়িয়ে বইয়ের টানে শিক্ষার্থীরা

ছবি: আগামীর সময়
একদিকে স্মার্টফোনের পর্দায় আটকে থাকা শৈশব, অনলাইন গেমের নেশা আর মাদকের ভয়াবহ ছোবল; অন্যদিকে বইয়ের পাতায় নতুন পৃথিবী খুঁজে ফেরার আনন্দ। সময়ের এই বিপরীত স্রোতে দাঁড়িয়ে ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ নিয়েছেন বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সিমাবাড়ী ইউনিয়নের বেটখৈর গ্রামের কয়েকজন স্বপ্নবাজ মানুষ।
তাদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘শেখ নূর মুহাম্মাদ স্মৃতি পাঠাগার’ এখন শিশু-কিশোর ও তরুণদের বইমুখী করার পাশাপাশি গ্রামীণ জনপদে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে।
প্রতিদিন বিকেল হলেই পাঠাগারটিতে বাড়তে থাকে খুদে পাঠকদের আনাগোনা। কেউ মগ্ন হয় রূপকথা ও গল্পের বইয়ে, কেউবা ইতিহাস, বিজ্ঞান, চিকিৎসা কিংবা ধর্মীয় বইয়ের পাতায় খুঁজে নেয় অজানা পৃথিবীর সন্ধান। মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের বদলে বইয়ের পাতায় মনোযোগী হয়ে ওঠা এসব শিশুর চোখেমুখে যেন নতুন কিছু জানার আনন্দ। চার হাজারের বেশি বইয়ের সংগ্রহ নিয়ে পাঠাগারটি হয়ে উঠেছে গ্রামের জ্ঞানপিপাসুদের নির্ভরতার জায়গা।
২০২২ সালে স্থানীয় শিক্ষক কাজী মুহাম্মাদ আলমগীর হোসাইনের উদ্যোগে কয়েকজন উদ্যমী তরুণকে সঙ্গে নিয়ে পাঠাগারটির যাত্রা শুরু হয়। নিজেদের উদ্যোগে ঘরের ব্যবস্থা করে সরকারি গ্রন্থাগার দপ্তরের পরামর্শে প্রথমে মাত্র ৫০০ বই নিয়ে শুরু হয়েছিল এর পথচলা। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন সুধীজন, প্রকাশনা সংস্থা ও একুশে বইমেলা থেকে সংগ্রহ করা বইয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে পাঠাগারটি। বর্তমানে প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত পাঠাগারটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। দৈনিক গড়ে ২০ থেকে ৩০ জন পাঠক এখানে বই পড়তে আসেন।
পাঠাগারটির প্রতিষ্ঠাতা কাজী মুহাম্মাদ আলমগীর হোসাইনের মতে, বই পড়ার অভ্যাস মানুষকে কেবল শিক্ষিতই করে না, তার চিন্তা, মনন ও মূল্যবোধকেও সমৃদ্ধ করে। তিনি বলেন, আকাশসংস্কৃতির এই যুগে পাঠ্যবইয়ের বাইরেও মানুষের জানার পরিধি বাড়ানো জরুরি। শিশু-কিশোর ও তরুণদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই তাঁদের এই প্রচেষ্টা।
পাঠাগারটির কার্যক্রম শুধু বই পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় দিবস উদযাপন, সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা এবং বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি নজরুলজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু পাঠাগারটির কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করেন।
পাঠাগারের নিয়মিত খুদে পাঠক তামিমের গল্পটিও বেশ চমৎকার। শুরুতে বাবার চাপে পাঠাগারে এলেও এখন বই পড়ার আনন্দই তাকে এখানে টেনে আনে। মোবাইল ফোনের প্রতি আকর্ষণের পাশাপাশি বইয়ের জগতেও সে খুঁজে পেয়েছে নতুন আনন্দ। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী হুমাইজিদের বিশ্বাস, পাঠ্যবইয়ের বাইরের জ্ঞান তাদের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে সম্ভাবনাময় এই উদ্যোগের সামনে রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতাও। পাঠক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে নতুন বইয়ের চাহিদা। আয়োজকদের হিসাবে, পাঠকদের প্রয়োজন মেটাতে অন্তত ১০ হাজার বই থাকা দরকার। এ ছাড়া বই সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত আলমারি ও র্যাকের অভাব রয়েছে। বিদ্যুৎ-সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থাও। পাঠাগারটির প্রতিষ্ঠাতা ভবিষ্যতে নিজ অর্থায়নে বহুতল ভবন নির্মাণ করে এর জন্য স্থায়ী কক্ষ বরাদ্দের পরিকল্পনা করছেন।
শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, বর্তমান সময়ে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়ায় তরুণদের একটি অংশ নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের দিকে ঝুঁকছে। তরুণ প্রজন্মকে বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদে ছোট পরিসরে হলেও পাঠাগার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বেটখৈর গ্রামের এই পাঠাগার হয়তো আকারে বড় নয়, নেই বিপুল আয়োজনের চাকচিক্যও। কিন্তু এর প্রতিটি বইয়ের পাতায় লুকিয়ে আছে একটি শিশুর নতুন করে ভাবতে শেখার সুযোগ, একজন তরুণের নিজেকে বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা। প্রযুক্তির ব্যবহারকে অস্বীকার না করে তার ক্ষতিকর আসক্তি থেকে নতুন প্রজন্মকে দূরে রেখে জ্ঞানচর্চায় যুক্ত করার এই উদ্যোগ তাই কেবল একটি পাঠাগারের গল্প নয়; এটি একটি আলোকিত সমাজ গড়ার স্বপ্ন।
যে গ্রামে একসময় শিশু-কিশোরদের অবসর কাটানোর অন্যতম সঙ্গী হয়ে উঠতে পারত স্মার্টফোন, সেই গ্রামেই এখন বইয়ের পাতায় ডানা মেলছে তাদের কল্পনা। বেটখৈরের এই ছোট্ট পাঠাগার যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে—একটি বই, একটি পাঠাগার আর কয়েকজন স্বপ্নবাজ মানুষের উদ্যোগও বদলে দিতে পারে একটি প্রজন্মের আগামী।




