পাবনা
৬ লাখ কোরবানির পশু প্রস্তুত, দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা

ছবি: আগামীর সময়
পাবনার পশুর হাটগুলোর ঐতিহ্য দেশজুড়ে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদ এলে এই জেলার খামারিদের ব্যস্ততা অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। জেলার বেড়া, সাঁথিয়া, সুজানগর, সদর, ঈশ্বরদী ও চাটমোহর উপজেলার প্রতিটি ঘরে ঘরে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। তবে পশুর এই আধিক্য আর প্রস্তুতির আড়ালে খামারিদের চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে উদ্বেগের রেখা।একদিকে উৎপাদন খরচের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা। এই দুইয়ের দোলাচলে দিশেহারা প্রান্তিক খামারি থেকে শুরু করে বড় খামার মালিকরা।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, এবার পাবনায় কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৫৭২টি। এর বিপরীতে জেলার ৩৩ হাজার ৪০টি খামারে কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত রয়েছে ৬ লাখ ৫৩ হাজার ৫৮৮টি। এর মধ্যে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫টি গরু এবং ৩ লাখ ৭৯ হাজার ১৭৭টি ছাগল ও ভেড়া রয়েছে। চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩ লাখ ১৬ হাজার পশু উদ্বৃত্ত। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের আশা, স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এই বিপুল সংখ্যক পশু ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বড় হাটে সরবরাহ করা হবে।
খামারিদের দুশ্চিন্তার প্রধান কারণ গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। সরেজমিনে চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া উপজেলার খামারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, গত দুই বছরে দানাদার খাদ্যের দাম বস্তাপ্রতি ৪০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
ভাঙ্গুড়া উপজেলার চৌবাড়িয়া গ্রামের খামারি ও পশু ব্যবসায়ী রাজু মোল্লা জানান, গত বছরের তুলনায় ৪০ কেজি ওজনের গমের ভুসি, মসুর ভুসি ও অ্যাংকর ডালের ভুসির দাম বস্তাপ্রতি বেড়েছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এমনকি ধানের কুঁড়া ও শুকনা খড়ের দামও মণপ্রতি ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
তিনি বলেছেন, ‘গরুর পেছনে মণপ্রতি বর্তমানে খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৮ হাজার টাকা। যারা শ্রমিক রেখে খামার চালান, তাদের খরচ আরও বেশি। অথচ বাজারে গত এক সপ্তাহে গরুর দাম মণে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পড়ে গেছে।’
সদর উপজেলার গয়েশপুর এলাকার খামারি বেলাল হাজির দুশ্চিন্তা বড় গরু নিয়ে। তিনি জানান, গত বছর ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকায় ১৩ মণ ওজনের একটি গরু কিনেছিলেন। এক বছরে লালন-পালনে খরচ হয়েছে আরও ২ লাখ টাকা। বর্তমানে গরুর ওজন প্রায় ২০ মণ।
‘এখন পর্যন্ত কোনো ক্রেতা দাম বলছে না। বড় গরুর খরিদ্দার কম, অথচ এগুলো পালতে খরচ সবচেয়ে বেশি। লোকসানে বিক্রি করতে হলে আমাদের পথে বসা ছাড়া উপায় নেই।’— বলেছিলেন বেলাল।
একই সুর নাজিরপুর এলাকার খামারি আবু তালেবের কণ্ঠেও। তিনি জানান, অন্যান্য বছর এই সময়ে খামারে ব্যাপারীদের ভিড় থাকলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। মানুষের ক্রয়-ক্ষমতা কমায় বড় গরুর চেয়ে মাঝারি গরুর দিকেই ঝোঁক বেশি ক্রেতাদের।
খামারিদের একটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো ভারত থেকে অবৈধ পথে গরু আসা। রাজু মোল্লা বলেছেন, ‘ভারতের গরু যদি দেশের বাজারে ঢুকে যায় তবে স্থানীয় খামারিরা চরম ক্ষতির মুখে পড়বেন। সারা বছরের মেহনত ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। সরকারের কঠোরভাবে নজর দেওয়া উচিত যাতে কোনোভাবেই ভারতের গরু হাটে না আসতে পারে।’
পাবনা শহরের বড় বাজারের গোখাদ্য বিক্রেতা আজমত আলী অবশ্য আশার কথা শুনিয়েছেন। জানালেন, ‘আমদানি সমস্যার কারণে ভুসির দাম আগে বেড়েছিল, তবে এখন সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে। আশা করা যায় এর সুফল খামারিরা পাবেন।’
খামারিদের আশ্বস্ত করে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. জহুরুল ইসলাম। বলেছেন, ‘আমরা মাঠ পর্যায়ে খামারিদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি। তাদের স্বার্থ রক্ষায় সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো এবং পশুর চলাচল নিয়ন্ত্রণে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাতে বাইরের কোনো গরু আমাদের বাজার নষ্ট করতে না পারে।’
‘খামারিরা যদি মণপ্রতি ৩২ থেকে ৩৪ হাজার টাকা দাম পান, তবে তারা লাভবান হবেন। আমরা আশা করছি এবার হাটগুলোতে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে।’—যোগ করেন তিনি।




