‘বিচার চাইতে গিয়ে এখন আমি নিজেই আসামি’

ভুক্তভোগী করিমন নেছা
মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে মামলা করায় উল্টো মামলার আসামি হয়েছেন ৫৩ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা ও তার পরিবারের সদস্যরা। গ্রেপ্তার আতঙ্কে বর্তমানে বাড়ি ছাড়া তারা। জীবিত ব্যক্তিদের মৃত দেখিয়ে এবং ভুয়া ভাগ্নে সাজিয়ে মামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে ওই দালালচক্রের বিরুদ্ধে। এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না ‘উল্টো মামলার’ বাদীকেও। তবে ন্যায়বিচারের স্বার্থে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে পুলিশ।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য।
মাদারীপুর সদর উপজেলায় পাঁচখোলা এলাকার বাসিন্দা করিমন নেছা। তার ছেলে মাসুম মাতুব্বর। তিনি সরাসরি ইতালি যাওয়ার জন্য চুক্তি করেন সোনা মিয়া ঘরামীর সঙ্গে।
জাজিরাকান্দি এলাকার আকুব আলী ঘরামীর ছেলে সোনা মিয়া।
সেই চুক্তির ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ২৩ মে ২২ লাখ টাকার বিনিময়ে মাসুমকে ইতালির পরিবর্তে লিবিয়ায় নিয়ে যায় দালালচক্র। সেখানে নির্যাতনের মাধ্যমে পরিবারের কাছ থেকে আরও ২৩ লাখ টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ। এ ঘটনায় সোনা মিয়াসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে গত ১৯ এপ্রিল মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন করিমন নেছা। আদালতের নির্দেশে ২২ এপ্রিল সদর মডেল থানায় মামলাটি রেকর্ড হয়।
মামলার বিষয়টি কোনোভাবে জানতে পারেন সোনা মিয়া। পরে তিনি শ্যালিকা পরিচয়ে ময়না বেগমকে বাদী করে করিমন নেছা, তার স্বামী ও দুই ছেলের বিরুদ্ধে মানবপাচার মামলা করেন। ওই মামলায় দাবি করা হয়, ময়না বেগমের বোন রহিমা ও তার স্বামী মোসলেম আকন মারা যাওয়ার পর তাদের ছেলে আল আমিনকে লালনপালন করেন তিনি। পরে আল আমিনকে ইতালির কথা বলে লিবিয়ায় নিয়ে আটকে রেখে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ৬ মাস ধরে তার কোনো খোঁজ নেই।
সরেজমিন শুক্রবার (২২ মে) বিকেলে পূর্ব ছিলারচর এলাকায় গিয়ে আল আমিনের বাবা মোসলেম আকন ও মা রহিমা বেগমের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
তারা জানান, তারা দুজনই জীবিত এবং ময়না নামে তাদের কোনো আত্মীয় নেই। আল আমিনের সঙ্গেও এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। এদিকে ময়না বেগমের বাড়িতে গিয়ে সেটি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়।
স্থানীয়রা জানান, ময়না বেগমের স্বামী ইসমাইল শিকদার ঢাকায় রিকশা চালান। ময়না বছরে দু-একবার এলাকায় আসেন।
ভুক্তভোগী করিমন নেছা বললেন, ‘বিচারের আশায় মামলা করে এখন আমি নিজেই আসামি হয়ে গেছি। পুরো পরিবার গ্রেপ্তার আতঙ্কে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই। দালাল সোনা মিয়া ও ময়না বেগমের কঠোর শাস্তি দাবি করছি।’
আল আমিনের বাবা মোসলেম আকন ও মা রহিমা বেগমের ভাষ্য, ‘ময়না নামে আমাদের কোনো আত্মীয় নেই। যারা এই ভুয়া মামলার সঙ্গে জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আমাদের পরিবারের নাম ব্যবহারকারী প্রতারকচক্রকে আইনের আওতায় আনলে মূল হোতারা বেরিয়ে আসবে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ময়না বেগমের কয়েকজন প্রতিবেশী জানান, ‘ময়নার আল আমিন নামের কোনো ভাগ্নে নেই। দালালচক্রকে সহযোগিতা করতেই তিনি বাদী হয়ে নির্দোষ মানুষকে হয়রানি করছেন।’
মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ফারিহা রফিক ভাবনা বলেছেন, ‘করিমন নেছা মামলা করার পর পাল্টা আরেকটি মামলা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। দ্বিতীয় মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হলে বাদীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’






