কখন জানি খালি হয় কার কোল

কেউ শিশুদের বাতাস করছেন পাখা দিয়ে। কেউবা কোলে নিয়ে বসে আছেন আদরের সন্তানকে। কেউ মুখে তুলে দিচ্ছেন ওষুধ। শিশুর যত্নে ব্যস্ত থাকা মায়েদের এমন দৃশ্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলার হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে। বলতে গেলে হাসি নেই কারও মুখেই। চিন্তার ভাঁজ প্রায় সবারই কপালে। অপেক্ষায় আছেন, কখন আদরের শিশু সুস্থ হবে। ফিরবেন বাড়ির সেই পরিচিত আঙিনায়। আবার অনেকে উদ্বিগ্ন। প্রায় দিনই কোনো না কোনো শিশু মারা যাচ্ছে এখানে।
এসব মৃত্যুর ভাবনা ছড়িয়ে যায় অন্য মায়েদের মনেও। তারাও চিন্তিত, উদ্বিগ্ন— না জানি আবার কখন খালি হয় কার কোল।
সম্প্রতি মমেক হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছে অনেক শিশুই। সুস্থতার সংখ্যাই বেশি। আবার কখনো কখনো ঘটছে মৃত্যুর ঘটনাও। হাসপাতাল থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্যনুযায়ী, গত ৩ জুন আট মাস বয়সী এক মেয়েশিশু মারা গেছে এখানে। তার বাড়ি ছিল গাজীপুর জেলার মাওনার শ্রীপুরে। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ছাড় নিয়েছে ১১ জন। ভর্তি হয়েছে ৩২ জন। ১৭ মার্চ থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত হাম উপসর্গে শিশু ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৯০৩ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ হাজার ৭৪৭ জন। আর হাম কেড়ে নিয়েছে ৪৬ শিশুর প্রাণ।
হাম ওয়ার্ডে গিয়ে শিশু রোগীদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের অনেকের বাড়িই বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন জেলায়। ময়মনসিংহ জেলার রোগীও আছে এখানে। রোগীদের বেশিরভাগই পাঁচ-ছয় দিন ধরে এসেছেন এখানে। কেউ কেউ এর আগে চিকিৎসা করিয়েছেন স্থানীয়ভাবে। তবে শিশুর অবস্থা জটিল হলে নিয়ে এসেছেন এখানে। কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার ফাতেমা জানালেন, তার বাচ্চার জ্বর আছে চার দিন ধরে। দুদিন আগে তিনি এখানে এসেছেন সন্তান নিয়ে। তিনি বললেন, ‘চিকিৎসা হচ্ছে। তবে আশপাশে কোনো বাচ্চা মারা গেলে খারাপ লাগে। লাগে ভয়ও।’
১২ মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে এসেছেন তারাকান্দা উপজেলার রমজান আলী। ১ জুন থেকে চিকিৎসা হচ্ছে। বাচ্চা আগের চেয়ে ভালো আছে।
ফুলপুর এলাকার আমেনা জানালেন, ঈদের পরদিন তিনি আট মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে এসেছেন। জ্বর ছিল। এখন একটু ভালো।
‘সাত মাসের শিশুকে নিয়ে এসেছি মে মাসের ২৯ তারিখ। চিকিৎসা চলছে। তবে চিন্তা দূর হয়নি’— বলছিলেন শেরপুরের বাসিন্দা সজীব মিয়া।
একাধিক রোগীর স্বজন জানান, কেউ মারা গেলে খারাপ লাগে তাদের। নিজের সন্তান নিয়েও ভয় হয়। সব সময় দোয়া করছেন আল্লাহর কাছে।
হাম ওয়ার্ডের দায়িত্বরত চিকিৎসক সহযোগী অধ্যাপক ডা. গোলাম মাওলা বললেন, ‘সর্বতোভাবে শিশুদের সুচিকিৎসা দিতে চেষ্টা করছি আমরা। অনেকেই ভালো হয়ে বাড়ি যাচ্ছে। আবার কখনো কখনো কারও মৃত্যু হচ্ছে, যা ব্যথিত করে আমাদেরও। তারপরও আমরা প্রত্যেক শিশুর জন্য লড়াই করে যাই শেষ পর্যন্ত।’




