মাদারীপুর
দখল-ভরাটে বিলুপ্তির পথে জলপথ

ছবি: আগামীর সময়
মাদারীপুরে ১৮৭৫ সালে আড়িয়াল খাঁ ও কুমার নদের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠে মাদারীপুর পৌরসভা। নদীভিত্তিক এই জনপদের প্রাণ ছিল অসংখ্য খাল ও নালা, যা দুই নদীর সঙ্গে সংযুক্ত থেকে শহরের পানি প্রবাহ, নৌ-যোগাযোগ, বাণিজ্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় রাখত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
শনিবার (১৬ মে) সকালে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় মাদারীপুর পৌরসভায় অর্ধশতাধিক খাল ছিল। তা এখন প্রভাবশালী অনেকের দখলে। কালের বিবর্তন, দখল ও ভরাটের কারণে সেই খালগুলোর বেশিরভাগই এখন বিলুপ্তির পথে।
পৌরসভার তথ্য মতে, বর্তমানে ২২টি খাল বিদ্যমান থাকলেও স্থানীয়দের দাবি— এ সংখ্যাও বাস্তব চিত্র তুলে ধরে না। অনেক খাল দখল হয়ে গেছে, কিছু সংকুচিত হয়ে নালায় পরিণত হয়েছে, আবার অনেকগুলোর নেই অস্তিত্বই।
পরিবেশবাদী সংগঠন ফ্রেন্ডস অব ন্যাচারের নির্বাহী পরিচালক রাজন মাহমুদ জানালেন, একসময় এই পৌরসভায় অসংখ্য খাল ছিল। বিভিন্ন সংস্থার অধীনে থাকা এসব খাল দখল ও ভরাটের কারণে হারিয়ে গেছে। অবশিষ্ট খালগুলো দ্রুত উদ্ধার জরুরি।
পৌরসভার স্থানীয় বাসিন্দা রব হাওলাদারের মতে, ছোটবেলা দেখতাম খাল দিয়ে নৌকা চলত, পণ্য পরিবহন হতো। এখন সেই খালগুলোর অস্তিত্বই নেই।
আরেক বাসিন্দা পরিতোষ মণ্ডল জানালেন, খাল ছিল শহরের প্রাণ। এখন দখল হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। এখানে আগে বরশি দিয়ে মাছ ধরতাম। এখন তো আর খাল খুঁজে পাওয়া যায় না। অধিকাংশ খাল প্রভাবশালীদের দখলে।
মাদারীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজের ভাষ্য, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় খালের গুরুত্ব অপরিসীম। এগুলো উদ্ধার করা এখন সময়ের দাবি।
খালগুলো সচল থাকলে পণ্য পরিবহন সহজ হতো। এখন সড়কেই সব চাপ পড়ছে, ফলে খরচও বাড়ছে, জানালেন স্থানীয় ব্যবসায়ী বাচ্চু হাওলাদার।
শিক্ষক সেলিনা আক্তারের মতে, খাল ভরাট হওয়ায় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। খালের ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতেই পারছে না নতুন প্রজন্ম।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, খাল উদ্ধার ও পুনঃখননের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, নইলে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম মিয়ার মতে, আড়িয়াল খাঁ ও কুমার নদের সঙ্গে সংযুক্ত অর্ধশতাধিক খালের এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়া শুধু ইতিহাসের ক্ষতি নয়, বরং একটি নগরের পরিবেশগত সংকটও। তাই অবশিষ্ট খালগুলো দখলমুক্ত করে পুনঃখননের মাধ্যমে প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন নাগরিক বাবুল আক্তার বললেন, একসময় এসব খাল ছিল শহরের প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল। বর্তমানে খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনের পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে, যা জনজীবনে বাড়াচ্ছে ভোগান্তি।
সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের একটি হচ্ছে খাল খনন। এরই মধ্যে খালগুলোর তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে, মাদারীপুর পৌরসভার প্রশাসক জেসমিন আক্তার বানুর মত।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে খালগুলো উদ্ধার ও সংরক্ষণ করা না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিবেশগত সংকটে পড়বে মাদারীপুর।




