৫০ বছর ধরে বায়োস্কোপ দেখান আগৈলঝাড়ার সর্বানন্দ মধু

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য বায়োস্কোপ দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন বরিশালের আগৈলঝাড়ার সর্বানন্দ মধু, ছবি : আগামীর সময়
৫০ বছরের অধিক সময় ধরে আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য বায়োস্কোপ দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন বরিশালের আগৈলঝাড়ার সর্বানন্দ মধু।
অভাব অনটনের কারণে এক সময় লেখাপড়ার বই বিক্রি করে চাল কিনে খাওয়া সর্বানন্দ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মেলা-অনুষ্ঠানে বায়োস্কোপ দেখিয়ে করেছেন বাড়ি-জমি। পড়াশুনা করিয়েছেন ভাই-বোনদের। প্রযুক্তির এই যুগে এসেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে অথবা মেলায় বায়োস্কোপ দেখান তিনি। দেশের বিভিন্ন জেলায় ঐতিহ্য চেনাতে এখনো কাঁধে বায়োস্কোপের বাক্স ঝুলিয়ে ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে ঘুরে বেড়ান তিনি। বিলুপ্তপ্রায় এই বায়োস্কোপ দেখিয়ে শিশুসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আনন্দ দেওয়ার মাধ্যমে নিজের সংসার চালাচ্ছেন সর্বানন্দ।
বরিশালের আগৈলঝাড়ার বাগধা গ্রামের বাসিন্দা সর্বানন্দ মধু। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার বয়স ৮১ বছর। ৫ ভাই-বোনের মধ্যে সর্বানন্দ মেজো। বাবা ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। বাবার কাছে কাজ শিখে কৈশোরেই একজন দক্ষ কাঠমিস্ত্রি হয়েছিলেন। ৫০ বছর আগে তার বয়স যখন ৩০ বছর, তখন যশোরের বোনাপোলে ১৮ টাকায় কেনেন বায়োস্কোপটি। নাম দেন ‘কায়দার কায়দা বায়োস্কোপ’। রঙ্গরস আর আকর্ষণীয় কথার ছন্দে এক হাতে ডুগডুগি অন্য হাতে বায়োস্কোপের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে আশপাশের গ্রাম ও মেলায় কায়দার কায়দা বায়োস্কোপ দেখাতে শুরু করেন তিনি। সেই শুরু, এরপর পেছনে তাকাতে হয়নি তার।
বায়োস্কোপে এক সঙ্গে দেখতে পারেন ৫ জন দর্শক। প্রথম প্রথম চাল বা ৫ পয়সা থেকে ১০ পয়সা, এরপর ৫০ পয়সা দিলেই দেখাতেন বায়োস্কোপ। গ্রামগঞ্জের হাট ও মেলায় অনুষ্ঠান ছাড়াও বায়োস্কোপ দেখানো হতো পাড়া-মহল্লায়। সময়ের সঙ্গে বায়োস্কোপ এখন বিলীনপ্রায়। তবে থেমে নেই সর্বানন্দের বায়োস্কোপ দেখানো। বর্তমানে নিজ এলাকাসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় মেলা বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বায়োস্কোপ দেখান তিনি। এখন সর্বানন্দের বায়োস্কোপ দেখতে গুনতে হয় ১০ টাকা। কেউ কেউ আবার খুশি হয়ে একটু বেশিও দেয়।
এভাবে ‘কায়দার কায়দা বায়োস্কোপ’ দেখাতে দেখাতে সর্বানন্দ এখন পরিচিতি পেয়েছেন‘কায়দার কায়দা’ নামে।
লাল বাক্সের সামনের দিকে দুই পাশে চোঙার মতো কয়েকটি মুখ প্রতিটি মুখেই লেন্স লাগানো। আর বাক্সের ভেতর কাপড়ে লাগানো থাকে ছবি। কাপড়টা পেঁচানো থাকে পাশের দুটি কাঠিতে। কাঠির ওপরের মাথায় বাক্সের বাইরে লাগানো থাকে একটা হ্যান্ডেল। এই হ্যান্ডেল ঘোরালে ছবিসহ কাপড়টা একপাশ থেকে গিয়ে আরেক পাশে পেঁচাতে থাকে। তখন চোঙায় চোখ লাগিয়ে দেখা যায় ছবিগুলো। লেন্সের সুবাদে তখন সেই ছবিগুলো দেখায় বড় আর কাছে। ছবির সঙ্গেসঙ্গে কাঠের করতাল বা ঝুনঝুনি অথবা ডুগডুগি বাজিয়ে সুরের ছন্দে ছন্দে দেয়া হয় মজার ধারাবর্ণনা।
মাঝে মাঝে বায়োস্কোপ দেখানো বন্ধ থাকলে অথবা অবসর পেলে বিভিন্ন হাট বাজারে বিক্রি করেন কবিরাজি মলম ও ইঁদুর মারার ওষুধ।
স্থানীয়রা জানান, কায়দার কায়দা বলে বিভিন্ন ছন্দে বায়োস্কোপ দেখাতে দেখাতে সর্বানন্দ এখন পরিচিতি পেয়েছে কায়দার কায়দা নামে। তিনি একজন সৎ ও সাদা মনের মানুষ।
কায়দার কায়দা নাম খ্যাত সর্বানন্দ জানান, গ্রামেগঞ্জে বায়োস্কোপ দেখিয়ে আমি আনন্দ পাই। টাকাও আসে তাতে। তবে নতুন নতুন প্রযুক্তির কারণে এখন আগের মতো মানুষ আর এসব দেখে না।




