গড়াইয়ের জলে নিভে গেল দুই বন্ধুর এসএসসির স্বপ্ন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কয়েক ঘণ্টা আগেও তাদের চোখে ছিল স্বপ্ন, মুখে ছিল হাসি। এসএসসি পরীক্ষার শেষ দিনের স্বস্তি আর আনন্দে ভেসে বেড়াচ্ছিল দুই বন্ধু। জীবনের প্রথম বড় পাবলিক পরীক্ষা শেষ করে তারা ভেবেছিল সামনে অপেক্ষা করছে নতুন এক ভবিষ্যৎ। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফেরা হলো না তাদের। কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর জল কেড়ে নিল দুই কিশোরের প্রাণ।
আজ বুধবার দুপুর আড়াইটার দিকে কুষ্টিয়া-হরিপুর সংযোগ সেতুর নিচে গড়াই নদীতে গোসল করতে নেমে মারা যায় কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর গ্রামের সাইফুল ইসলামের ছেলে অপূর্ব ইফতি তাইফ (১৭) এবং একই এলাকার নুরুল ইসলামের ছেলে সাকিবুল ইসলাম (১৮)। তারা দুজনেই ২০২৬ সালের চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল।
তাইফ ও সাকিবুল কুষ্টিয়া দি ওল্ড হাই স্কুলের শিক্ষার্থী। ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে বেড়ে ওঠা এই দুই বন্ধু একই গ্রামের বাসিন্দা। একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া, পড়াশোনা, আড্ডা—সবকিছুতেই ছিল তাদের গভীর বন্ধুত্ব। আর সেই বন্ধুত্বের শেষ মুহূর্তটাও হলো একসঙ্গে।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বুধবার ছিল তাদের এসএসসি পরীক্ষার শেষ দিন। পরীক্ষা শেষে বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে তারা ছুটে যায় গড়াই নদীর পাড়ে। নদীতে নেমে হাসি-আনন্দে মেতে উঠেছিল সবাই। কিন্তু আনন্দের সেই মুহূর্তই একসময় রূপ নেয় বিভীষিকায়।
একপর্যায়ে তাইফ ও সাকিবুল অগভীর অংশ থেকে গভীর পানিতে চলে যায়। কেউ বুঝে ওঠার আগেই তারা তলিয়ে যায় নদীর জলে। মুহূর্তেই আনন্দ থেমে যায় আতঙ্ক আর চিৎকারে।
স্থানীয়রা দ্রুত তাদের উদ্ধারে নামেন। অনেক চেষ্টার পর দুজনকে নদী থেকে তুলে দ্রুত কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে সেখানে পৌঁছানোর আগেই নিভে যায় দুই তরুণ প্রাণ।
হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ইকবাল হাসান জানান, পানিতে ডুবে যাওয়া অবস্থায় দুই শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাদের মৃত্যু হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কুষ্টিয়ার সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. আরশেদ আলী বলেছেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু তার আগেই স্থানীয়রা দুই শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
একটি আনন্দঘন বিকেল কীভাবে চোখের পলকে বিষাদে পরিণত হতে পারে, গড়াই নদী যেন তারই নির্মম সাক্ষী হয়ে রইল। পরীক্ষার খাতা জমা দিয়ে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে যে দুই বন্ধু নদীর জলে নেমেছিল, তারা আর ফিরল না বাড়িতে। তাদের স্কুলব্যাগ পড়ে রইল, খাতা-কলম পড়ে রইল, শুধু থেমে গেল দুটি জীবনের গল্প।
একসঙ্গে দুই শিক্ষার্থীর এমন করুণ মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে হাটশ হরিপুর গ্রাম। স্বজনদের আহাজারি আর সহপাঠীদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। যে বয়সে তাদের কলেজে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখার কথা ছিল, সেই বয়সেই তারা চলে গেল না ফেরার দেশে।




