রাজফুলবাড়িয়া ভূমি অফিসে দালালের দৌরাত্ম্য, আবার এক তহশিলদারই বারবার

সাভারের রাজফুলবাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিস
সরকারি বদলি নীতিমালার ফাঁক গলে একই কর্মস্থলে তিন দফায় পদায়ন পেয়েছেন ঢাকার সাভারের রাজফুলবাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ‘ভূমি সহকারী কর্মকর্তা’ (তহশিলদার) জাহাঙ্গীর আলম। দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগে সেখানে ‘দালালচক্র’ গড়ে তোলার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।
নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়াসহ বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জাহাঙ্গীর আলম প্রথম দফায় ২০২১ সালের ২৬ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৪ জুলাই পর্যন্ত টানা দুই বছর ১১ মাস ৯ দিন ওই কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। পরে বদলি হলেও কয়েক মাসের ব্যবধানে একই বছরের ১২ নভেম্বর আবারও ওই কার্যালয়ে যোগ দেন।
দ্বিতীয় দফায় জাহাঙ্গীর ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ মাস ১২ দিন দায়িত্ব পালন করেন। এরপর আবারও বদলি হন। তবে কয়েক মাসের মধ্যেই ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি তৃতীয়বারের মতো একই কার্যালয়ে পদায়ন পান তিনি। এখনো সেখানেই কর্মরত।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভূমি অফিসের গেট থেকে শুরু করে ভেতরে কর্মকর্তাদের সহকারী পরিচয়ে একাধিক ব্যক্তির আনাগোনা রয়েছে। অন্তত ৭ থেকে ৮ জনের একটি দালালচক্র নিয়মিত সেখানে সক্রিয়। তাদের মধ্যে জনি, গৌর চন্দ্র, তুষার, মোহাম্মদ আলী, কামাল, নাঈম ও মারুফসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, নামজারি ও জমির খাজনা দেওয়ার জন্য নির্ধারিত সরকারি ফি রয়েছে। কিন্তু দালালদের মাধ্যমে কাজ না করালে কাগজপত্রে ভুল থাকার অজুহাতে তাদের মাসের পর মাস ঘোরানো হয়। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ টাকা দিয়ে দালালদের মাধ্যমে কাজ করাতে হয়।
এ ছাড়া হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও মধুমতি মডেল টাউন নামে পরিচিত মেট্রো মেকার্স অ্যান্ড ডেভলপার্স কোম্পানির জমির নামজারি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে।
মেট্রো মেকার্স ডেভলপার্স কোম্পানি একটি বিল ভরাট করে হাউজিং কোম্পানি গড়ে তুলেছিল। বিল ভরাট করায় পরিবেশ আইনজীবী সংগঠন (বেলা) একটি মামলা করেছিল। মামলায় আদালত মেট্রো মেকার্স ডেভেলপার্স কোম্পানির জমি ক্রয়-বিক্রয়সহ খারিজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মেট্রো মেকার্সের নামে থাকা জমি নতুন করে খারিজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ভাকুর্তা এলাকার বাসিন্দা নিরঞ্জন মৃধা জানান, তিনি পৈতৃকভাবে সম্পত্তি পেয়েছিলেন। একদিন খাজনা দিতে গিয়ে দেখেন, তাদের নামে থাকা ১৩ শতাংশ জমি অন্য একজনের নামে নামজারি হয়ে গেছে। পরে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের দালালদের মাধ্যমে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ করে তিনি জমিটি আবার নিজের নামে ফিরে পান বলে জানান।
আহসান হাবিব নামে আরেক সেবাগ্রহীতা বলেন, ‘পর্চা বা যেকোনও কাগজপত্রের জন্য গেলে অফিসের ভেতরের দালালরাই অফিসের কর্মকর্তাদের মতো বসে কাজ করে। বুঝার উপায় নেই তারা দালাল না অফিসের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। সেখানে গেলেই টাকা ছাড়া কোনও সেবা মিলে না। তাদের নিয়ন্ত্রণ করেন তহশিলদার নিজেই।’
এ বিষয়ে সাভার উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার মো. ইমন হাছান জানান, বেলার করা একটি রিটের পর হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী মেট্রো মেকার্স অ্যান্ড ডেভলপার্স কোম্পানির কিছু দাগে নামজারি বন্ধ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে রাজফুলবাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বললেন, ‘মূলত মেট্রো মেকার্স অ্যান্ড ডেভলপার্স কোম্পানির বেশ কিছু জায়গায় নাম খারিজ বন্ধ রয়েছে। তবে আদালতের নিষেধাজ্ঞা যেসব দাগে রয়েছে, সেগুলো থেকে খারিজ করা হয়নি।’
আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মেট্রো মেকার্স অ্যান্ড ডেভলপার্স কোম্পানির নামে থাকা জমি কীভাবে নামজারি দেওয়া হলো, জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেননি।
ভূমি অফিসের ভেতরে দালালদের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন কি না, জানতে চাইলে এ বিষয়েও কোনও উত্তর না দিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন জাহাঙ্গীর আলম ।
এ বিষয়ে সাভার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাহাত খান বলেন, ‘আমি এখানে নতুন এসেছি। এ বিষয়ে তেমন কিছু জানি না। তবে বিষয়টি দেখব।’
এ বিষয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা পারভীন আগামীর সময়কে বলেন, নিয়মবহির্ভূতভাবে কোনো নামজারি করা হলে এবং আদালতের আদেশ অমান্য করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দালালদের বিষয়ে তার বক্তব্য, ‘ভূমি অফিসের রেকর্ড রুমে সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বাইরে অন্য কারও প্রবেশের সুযোগ নেই। তবে এমন ঘটনা ঘটে থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



