বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র
৫২ কোটিতে মেরামতের পরও ত্রুটি
- সাত মাস ধরে সংস্কারের পর পাঁচ দিনেই অচল
- সংস্কারে অনিয়ম দেখছেন বিশেষজ্ঞরা

ছবি: আগামীর সময়
প্রায় ৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে সাত মাস ধরে সংস্কার কাজ শেষে উৎপাদনে ফিরেছিল বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩ নম্বর ইউনিট। কিন্তু চালুর মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় গত ২৫ মে বন্ধ হয়ে যায় ইউনিটটি। এরপর ২০ দিন পার হলেও সেটি চালু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এতে বিপুল টাকা ব্যয়ে এই সংস্কার নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
২০২৫ সালের অক্টোবরে জেনারেল ওভারহলিংয়ের (বড় ধরনের মেরামত) জন্য বন্ধ করা হয় বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৩ নম্বর ইউনিটটি। এরপর সাত মাস সংস্কার কাজ শেষে এটি চালু হয়। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয় গত ২০ মে থেকে। কিন্তু ২৫ মে দুটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশে ত্রুটি দেখা দিলে ফের বন্ধ হয়ে যায় উৎপাদন।
অবশ্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তাদের দাবি, চীন থেকে নতুন যন্ত্রাংশ আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ফের চালু করতে লাগতে পারে আরও দুই সপ্তাহ।
তবে মেরামতের পর কেন্দ্র বিকল হয়ে যাওয়াকে অস্বাভাবিক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, জেনারেল ওভারহলিংয়ের উদ্দেশ্যই হলো দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করা। সেখানে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পর মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে ইউনিটটি বিকল হয়ে পড়া স্বাভাবিক বিষয় নয়।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের একাধিক প্রকৌশলী ও কর্মচারী অভিযোগ করেন, সংস্কার কাজের সময় কিছু যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন না করে পুরনোগুলোই মেরামত করে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রশ্ন রয়েছে কাজের গুণগত মান নিয়েও। তারা বলছেন, ওভারহলিংয়ের সময় যেসব যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল, তার সব পরিবর্তন করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ, একটি পূর্ণাঙ্গ ওভারহলিংয়ের পর এত দ্রুত বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দেওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক।
পিডিবি দিনাজপুর অফিসের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোস্তাকিম। ছয় বছর আগে অবসরে যাওয়া এ প্রকৌশলী বলছেন, ইলেকট্রিক্যাল পাওয়ার হাউজে ওভারহলিং বলতে বোঝায় পূর্ণাঙ্গ মেরামত কাজ। সেক্ষেত্রে যেখানে নতুন যন্ত্রাংশ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, তাই করা হয়ে থাকে। কোনো জায়গায় ব্যত্যয় ঘটলে বা নতুন যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা না হলে বা নিম্নমানের যন্ত্রাংশের কারণে যেকোনো ইলেকট্রিক্যাল মেশিনারিজ বিকল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শিল্পকারখানার বয়লার, টারবাইন, জেনারেটর ও পাওয়ার প্ল্যান্ট রক্ষণাবেক্ষণে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেনের। বিসিআইসির অধীন ঘোড়াশাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি থেকে চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে অবসরে যাওয়া এ প্রকৌশলী বলছেন, সঠিকভাবে ওভারহলিং কাজ সম্পন্ন হলে যেকোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লার, টারবাইন ও জেনারেটর অন্তত তিন-চার বছর সচল থাকার কথা। মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে আবার অচল হয়ে পড়া অস্বাভাবিক ঘটনা। কারিগরিভাবে তদন্ত হলে জানা যাবে এর মূল কারণ।
এদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক অস্বীকার করলেন সব অভিযোগ। তিনি জানালেন, বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারিগরি দিক দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হারবিন ইন্টারন্যাশনাল। তারা প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ চীন থেকে এনেছে। যন্ত্রাংশ পাওয়ার পর মেরামত কাজ সম্পন্ন করে ফের চালু করা হবে ইউনিটটি।
আবু বক্কর সিদ্দিকের ভাষ্য, চুক্তি অনুযায়ী চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওভারহলিং সম্পন্ন হয়েছে। তাদের ৪ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। নতুন করে যন্ত্রাংশ লাগানোর দায়িত্ব তাদেরই। অবশ্য তারা চুক্তির অর্থ দিয়েই ঠিক করে দেবে। এতে নতুন করে কোনো অর্থ ব্যয় হবে না সরকারের।
৫২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট তিনটি ইউনিট রয়েছে। এর মধ্যে ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২ নম্বর ইউনিট ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে বন্ধ রয়েছে।




