আগামীর সময়

ঐতিহাসিক রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও দিবস আজ

ত্যাগের স্বীকৃতি আজও জাতীয়ভাবে মেলেনি

ত্যাগের স্বীকৃতি আজও জাতীয়ভাবে মেলেনি

ছবিঃ আগামীর সময়

আজ ২৮ মার্চ ঐতিহাসিক রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও দিবস। ২৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মাত্র একদিন পরই রংপুরবাসী ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল, সে পথ ধরেই সূচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র সংগ্রাম। স্বাধীনতাপ্রিয় প্রতিবাদী রংপুরবাসী লাঠি-সোঠা, তীর-ধনুক নিয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে জন্ম দিয়েছিল এক অনন্য ইতিহাসের। ঐতিহাসিক ২৮ মার্চ রংপুরবাসীর কাছে অবিস্মরণীয় দিন। প্রতি বছর এই দিনে স্থানীয় জনগনের উদ্যোগে নানা অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে পালিত হয় ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও দিবস। আজকের এই দিনে রংপুর নগরীর নিসবেতগঞ্জে শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত রক্তগৌরবে বিস্তারিত কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।

একাত্তরের ৩ মার্চ। মিছিল আর শ্লোগানে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছিল গোটা রংপুর। প্রতিবাদমুখর মানুষের মিছিলে নির্বিচারে চালানো হয় গুলি। শহীদ হন কিশোর শংকুসহ আরও তিনজন। রংপুরাঞ্চলে তারাই স্বাধীনতার প্রথম শহীদ। তাদের রক্তদানের মাধ্যমে উত্তাল হয়ে ওঠে রংপুর। স্বাধীনতাকামী মানুষ সংগঠিত হতে থাকে। প্রস্তুতি গ্রহণ করে সশস্ত্র সংগ্রামের। এরই অংশ হিসেবে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও এর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে স্বাধীনতাকামী মানুষ। দিনক্ষণ ঠিক হয় ২৮ মার্চ। ঘেরাও অভিযানে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে রংপুরের বিভিন্ন হাটে-বাজারে ঢোল পিটানো হয়। আর এ আহ্বানে অর্ভূতপূর্ব সারা মেলে। সাজ সাজ রব পড়ে যায় চারিদিকে। যার যা আছে তাই নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নেয় এ অঞ্চলের ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে ছাত্র, কৃষক, দিনমজুরসহ সকল পেশার সংগ্রামী মানুষ। রংপুরের আদিবাসীরাও তীর-ধনুক নিয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকে। এক্ষেত্রে মিঠাপুকুর উপজেলার ওরাঁও সম্প্রদায়ের তীরন্দাজ সাঁওতালদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তীর-ধনুক, বল্লম, দা, বর্শা নিয়ে তারা যোগ দিয়েছিল ঘেরাও অভিযানে।

’৭১ এর ২৮ মার্চ রোববার সকাল থেকে রংপুরের বিভিন্ন এলাকার মানুষ সংগঠিত হতে থাকে। সময় যত এগিয়ে আসে উত্তাপ আর উত্তেজনা যেন ততই বাড়তে থাকে। সকাল ১১টা বাজতে না বাজতেই সাজ সাজ রব পড়ে যায় চারিদিকে। জেলার মিঠাপুকুর, বলদীপুকুর, মানজাই, রানীপুকুর, তামপাট, পালিচড়া, বুড়িরহাট, গঙ্গাচড়া, শ্যামপুর, দমদমা, লালবাগ, গনেশপুর, দামোদরপুর, পাগলাপীর, সাহেবগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হতে থাকে। সবার হাতে ছিল লাঠি-সোটা, তীর-ধনুক, বর্শা, বল্লম, দা ও কুড়াল।

রংপুর মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার সদরুল আলম দুলু জানান, মূলত রংপুরে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল ৩ মার্চ। ওইদিনের হরতালে মিছিলে যোগ দিয়ে তৎকালীন অবাঙালি সরফরাজ খানের বাসার ওপর উর্দুতে লেখা একটি সাইনবোর্ড সরাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সপ্তম শ্রেণির ছাত্র শংকু সমজদার। এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে এক ভয়াল শহরে রুপ নেয় রংপুর। উত্তাল হয়ে ওঠে রাজপথ। সেদিনের সেই ঘটনার মধ্য দিয়েই রংপুরে সূচনা হয় মুক্তিযুদ্ধের। এরপর আসে ভয়াল ২৫ মার্চ। ওইদিন দুপুরের পরপরই শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে অপহরণ করা হয় শান্তি চাকী, খুররম, মহররম, জররেজ, দুলাল, গোপাল চন্দ্র, উত্তম কুমার অধিকারী, সতীশ হাওলাদার, দুর্গা দাসসহ ১১ জনকে। এরপর ৩ এপ্রিল দখিগঞ্জ শশ্মানে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়।

২৮ মার্চ রংপুরের মানুষ জেগে উঠেছিল এক নবচেতনায়। স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ মানুষ রংপুরের বিভিন্ন অঞ্চল হতে লাঠিসোটা, তীর ধনুক, বল্ল¬ম নিয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বাঁশের লাঠি আর তীর-ধনুক নিয়ে পাকিস্তানি হায়েনাদের আবাসস্থল ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণের ঘটনা ইতিহাসে বিরল। এমনি এক ঘটনাই সেদিন ঘটিয়েছিলেন রংপুরের বীর জনতা। স্বাধীনতাকামী রংপুরের মানুষ ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওয়ের মধ্যদিয়ে শুরু করেছিল মহান মুক্তিযুদ্ধ। ২৮ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ তথা পাক হানাদার বাহিনীর সাথে এটাই তাদের মুখোমুখি প্রথম যুদ্ধ। ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও অভিযানে যেখানে আত্মত্যাগী মানুষগুলো শেষবারের মত একত্রিত হয়েছিল, সেই ঐতিহাসিক নিসবেতগঞ্জ এলকায় ২০০৩ সালে ‘রক্ত গৌরব’ নামে নির্মিত হয় একটি স্মৃতিস্তম্ভ যা আজও নিরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সেদিনের সেই ত্যাগের স্বীকৃতি জাতীয়ভাবে আজো মেলেনি।

    শেয়ার করুন: