কেউ শোনে না কাজলার কান্না

ছবি: আগামীর সময়
একসময়ের প্রবল স্রোতঃস্বিনী কাজলা নদী এখন অনেকটাই হারিয়েছে তার নাব্য। দখল, দূষণ এবং দীর্ঘদিন সংস্কার ও খননের অভাবে মেহেরপুরের ঐতিহ্যবাহী এই নদী অনেক জায়গায় পরিণত হয়েছে সরু খাল কিংবা আবাদি জমিতে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুই তীর দখল করে ঘরবাড়ি নির্মাণ ও চাষাবাদের কারণে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে নদীটি। দ্রুত খনন এবং দখলমুক্ত করা না হলে অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
মেহেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ছোট-বড় ৫৪টি খাল এবং চারটি নদী রয়েছে। একসময় এসব খালের মাধ্যমে বর্ষার পানি প্রবাহিত হতো কাজলা নদীতে। কিন্তু নদীর তলদেশে পলি জমে নাব্য কমে যাওয়ায় সেই পানি প্রবাহিত হতে পারে না স্বাভাবিকভাবে। ফলে বর্ষা মৌসুমে তলিয়ে যায় হাজার হাজার বিঘা কৃষিজমি। আর শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেয় সেচ সংকট। পানি প্রবাহের জন্য খনন করা অধিকাংশ খালও হয়ে গেছে ভরাট।
ভারতের জলাঙ্গী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত মাথাভাঙ্গা নদীর একটি শাখা কাজলা। প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার হিন্দা মাঠ, নওয়াপাড়া, ভাটপাড়া ও গাড়াডোব অতিক্রম করে সদর উপজেলার আমঝুপি গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মিলিত হয়েছে ভৈরব নদে।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, ব্রিটিশ আমলে এই নদীপথ ব্যবহার করে কলকাতাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নৌযানে পরিবহন করা হতো পণ্য। নদীর গভীরতা ও প্রবাহ স্বাভাবিক থাকায় বন্যার ঝুঁকিও তুলনামূলক কম ছিল। তবে দেশভাগের পর দীর্ঘ সময় ধরে খনন না হওয়ায় তলদেশে জমতে থাকে পলি। এই সুযোগে নদীর চর ও দুই তীর দখল করে শুরু হয় চাষাবাদ। অনেক স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে পাকা ঘরবাড়ি ও স্থাপনা। নদীর অনেক অংশে এখন খুঁজে পাওয়া যায় না পানির অস্তিত্ব।
গাংনী উপজেলার ভাটপাড়া গ্রামের মৎস্যজীবী ইদ্রিস আলী বলেছেন, ‘একসময় কাজলা নদীতে মাছ ধরে সংসার চলত আমাদের। প্রায় ১০ বছর ধরে পর্যাপ্ত পানি নেই নদীতে। অনেকে নদীর তীরে করছেন চাষাবাদ। নদী আবার জেগে উঠলে মৎস্যজীবীরাও ফিরে পাবেন তাদের জীবিকা।’ তার মতে, নদী পুনরুদ্ধার করা গেলে দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদনও বাড়বে।
নদী একটি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। কাজলা নদীও মেহেরপুরের এমনই একটি ঐতিহ্য বলে মনে করেন ভাটপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুর রহিম। তবে দখল ও অব্যবস্থাপনায় নদীটি মৃতপ্রায়।
গাংনী উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান সেলিনা মমতাজ কাকলির মতে, ৪০ কিলোমিটার জুড়ে কোথাও নদী আছে, কোথাও নেই। খননের মাধ্যমে কাজলাকে ফিরিয়ে আনা গেলে মেহেরপুরের ঐতিহ্যও হবে পুনরুজ্জীবিত।
মেহেরপুর সরকারি কলেজের সাবেক শিক্ষক ও পরিবেশবিদ এনামুল আজিমের দাবি, নদী খনন করা হলে ফিরবে পরিবেশের ভারসাম্য। তৈরি হবে দেশীয় মাছের অভয়াশ্রম। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে হাজারো মানুষের। বর্তমান সরকার বিভিন্ন নদী ও খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের কাজও শুরু হতে দেখা গেছে।
মেহেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হান্নান জানিয়েছেন, কাজলা নদী খননের বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে নেওয়া হবে নাব্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ।’
সরকার নদী ও খাল খননে গুরুত্ব দিচ্ছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী বলেছেন, ‘কাজলা নদী দখলমুক্ত ও পুনঃখননের বিষয়ে আবেদন করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে।’




