জরাজীর্ণ ঘরে ৩৭ বছরের পাঠশালা, শিশুদের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন নমিতা

নমিতা মন্ডলের জরাজীর্ণ ছোট্ট একটি ঘরেই চলছে কোমলমতি শিশুদের পড়াশোনা
কারও গায়ে নেই জামা। কেউ গরমে হাঁসফাঁস করছে। আবার কেউ খাতা কিংবা বই দিয়ে নিজেকেই বাতাস করছে। পাশে বসে থাকা অভিভাবকরাও কখনো খাতা, কখনো বই দিয়ে সন্তানকে বাতাস করছেন। নেই ফ্যান, নেই টয়লেট, নেই ভালো কোনো ব্ল্যাকবোর্ড। জরাজীর্ণ ছোট্ট একটি ঘরেই চলছে কোমলমতি শিশুদের পড়াশোনা।
বৃষ্টি নামলেই বাড়ে দুর্ভোগ। ঘরের ভেতর পানি পড়ে, ভিজে যায় শিশুদের বই-খাতা। নেই ভালো বেড়া, নেই পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা। এমন নানা সংকটের মধ্যেই শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে বাগেরহাটের চিতলমারীর চরবানিয়ারী ইউনিয়নের চণ্ডীর ভিটার গরীবপুর উত্তরপাড়া পাঠশালা।
স্বামী পঙ্গু, সংসারে অভাব-অনটন। নিজের দুই সন্তানকে পড়াশোনা করানোর পাশাপাশি পরিবারের খরচ চালাতে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করছেন নমিতা মণ্ডল। সেই সংগ্রামের মধ্যেই শিশুদের পড়ানোর কাজ শুরু করেন তিনি। ১৯৮৯ সালে এসএসসি পাস করার পর থেকেই স্থানীয় শিশুদের পড়ানো শুরু করেন। দীর্ঘদিনের সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে স্থাপিত হয় গরীবপুর উত্তরপাড়া পাঠশালা।
মাত্র পাঁচজন শিক্ষার্থী দিয়ে শুরু হয়েছিল পাঠশালাটির পথচলা। তখন জনপ্রতি মাসে ৩০ টাকা করে নেওয়া হতো। বর্তমানে জনপ্রতি ২৫০ টাকা করে নেওয়া হয়। সপ্তাহে ছয় দিন—সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত শিশুদের পাঠদান করেন নমিতা। অর্থের পরিমাণ বাড়লেও পাঠশালাটির অবকাঠামোগত সংকট কাটেনি।
নমিতা মণ্ডল বলেছেন, সংসারে সচ্ছলতা ছিল না। আমার স্বামী পঙ্গু হওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। নিজের সন্তানদের লেখাপড়া করানো এবং সংসারের খরচ চালানোর তাগিদেই ৩০ টাকা থেকে শিশুদের পড়ানো শুরু করি। পরে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ে এবং বেতনও ২৫০ টাকা হয়েছে।
তিনি বলেছেন, এই এলাকায় একসময় শিক্ষার খুবই দুরবস্থা ছিল। স্থানীয় ছেলেমেয়েরাই আমাকে এখানে নিয়ে আসে। প্রথমে পাঁচজন শিক্ষার্থী দিয়ে শুরু করেছিলাম। কখনো পানির মধ্যে, কখনো রাস্তার পাশে, আবার কখনো কারও বাড়ির উঠানে বসিয়ে শিশুদের পড়িয়েছি। সবার সহযোগিতায় কোনোভাবে পাঠশালাটি টিকিয়ে রেখেছি।
সংসারের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি নিজের দুই সন্তানকেও পড়াশোনা করিয়েছেন নমিতা। তারা এইচএসসি পাস করেছেন। বর্তমানে তাদের একজন বিএ পর্যন্ত পড়ছেন। নমিতার স্বামী আগে ভ্যান চালাতেন। পরে পঙ্গু হয়ে যাওয়ায় এখন আর কাজ করতে পারেন না। ফলে সংসার ও সন্তানদের লেখাপড়ার দায়িত্বও সামলাতে হচ্ছে তাকে।
সরেজমিন দেখা যায়, ছোট্ট একটি জরাজীর্ণ ঘরে গাদাগাদি করে বসে আছে শিশুরা। কারও গায়ে জামা নেই, কেউ প্রচণ্ড গরমে অস্থির হয়ে পড়ছে। অভিভাবকদের কেউ বই, কেউ খাতা দিয়ে সন্তানকে বাতাস করছেন। ঘরে নেই কোনো বৈদ্যুতিক ফ্যান। ফলে গরমে শিশুদের পড়াশোনা করাই কঠিন হয়ে পড়ছে।
শিশুদের হাতে নেই পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ। একটি পুরনো ও ভাঙাচোরা ব্ল্যাকবোর্ড দিয়েই চলছে পাঠদান। নেই চেয়ার-টেবিল কিংবা বেঞ্চের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। কোনো কোনো শিশু মেঝেতে বসেই পড়াশোনা করছে।
বৃষ্টি এলেই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়। ঘরের ছাউনি ও বেড়া ভালো না থাকায় পানি ঢুকে পড়ে। ভিজে যায় শিশুদের বই-খাতা। পাঠশালাটিতে নেই একটি শৌচাগারও। ফলে ছোট শিশুদের প্রয়োজনের সময় বাইরে যেতে হয়।
এই ছোট্ট ঘরেই প্রতিদিন শিশুদের হাতে-খড়ি হচ্ছে। কেউ খাতায় অক্ষর লেখে, কেউ ছড়া বলে, আবার কেউ গানের মাধ্যমে শেখার চেষ্টা করে। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিশুদের কণ্ঠে শোনা যায় পড়াশোনা ও ছড়ার আওয়াজ।
নমিতা মণ্ডল বলেছেন, এখানে ভালোভাবে বসার ব্যবস্থা নেই। বাথরুম নেই, খাওয়ার পানির ব্যবস্থাও নেই। গরমের সময় শিশুরা ছটফট করে। একটি ভালো ব্ল্যাকবোর্ডও নেই, ভাঙাচোরা বোর্ড দিয়ে পড়াতে হয়। চেয়ার-বেঞ্চও নেই। বর্ষাকালে পানি জমে যায়।
তিনি আরও বলেছেন, আমি এই শিশুদের নিজের সন্তানের মতো মনে করে পড়াই। সরকার যদি এই পাঠশালার দিকে একটু নজর দিত, তাহলে আরও ভালোভাবে তাদের পড়াশোনা করাতে পারতাম। আমাদের কষ্টও কিছুটা কমত।
পাঠশালায় সন্তানকে পড়াতে আসা স্বপ্না বিশ্বাস বলেছেন, এখানে লেখাপড়া ভালো হয় বলেই ছেলেকে নিয়ে আসি। কিন্তু ফ্যান নেই, গরমে বসতে খুব কষ্ট হয়। বর্ষাকালে পানি জমে যায়। বাচ্চাদের জন্য একটি টয়লেটও নেই।
অভিভাবক সোনালী বিশ্বাস বললেন, এখানে অনেক ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করে। লেখাপড়ার মানও ভালো। তাই মেয়েকে এখানে নিয়ে আসি। কিন্তু ভালো পরিবেশ নেই, বসার ব্যবস্থা নেই। গরমে ফ্যানের সমস্যা হয়। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতর পানি পড়ে, তখন বসে পড়াশোনা করানো কঠিন হয়ে যায়।
আরেক অভিভাবক স্বপ্না গাইন বলেছেন, আমি নাতিকে নিয়ে এখানে আসি। এখানে অনেক কষ্ট হয়। ফ্যান নেই, বসারও ভালো ব্যবস্থা নেই। কোনো রকমে ঘর করা হয়েছে। চেয়ার-টেবিল নেই, খাবার পানির ব্যবস্থা নেই, টয়লেটও নেই। এগুলোর ব্যবস্থা হলে বাচ্চারা আরও ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারত।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়া এই পাঠশালাটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি। একটি নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ, ভালো বেড়া ও ছাউনি, চেয়ার-টেবিল, ফ্যান, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, শৌচাগার এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করা গেলে শিশুদের পড়াশোনার পরিবেশ অনেকটাই উন্নত হবে।
অভাবের সংসারে নিজের জীবন-সংগ্রামের পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন নমিতা মণ্ডল। ৩০ টাকা থেকে শুরু হওয়া তার সেই পথচলা আজ ২৫০ টাকার পাঠশালায় এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু জরাজীর্ণ ঘর আর নানা সংকটের মধ্যেও থেমে নেই শিশুদের পড়াশোনা। সপ্তাহে ছয় দিন, প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে সেই ছোট্ট ঘরেই নতুন করে শুরু হচ্ছে শিশুদের স্বপ্ন দেখার পাঠ।




