‘বনে গেলে ফিরতে পারব তো?’

ছবিঃ আগামীর সময়
দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। কিন্তু সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরার উপকূলীয় জনপদে ঈদের আনন্দ নেই। চারদিকে যখন উৎসবের প্রস্তুতি চলছে, তখন উপকূলের জেলে পরিবারগুলোর জীবনে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক আর বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস। বনদস্যুদের পুনরুত্থান, নিরাপত্তাহীনতা এবং আয়-রোজগারের সংকটে তাদের ঈদ এবার অনেকটাই ম্লান।
জেলার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার বিভিন্ন জেলে পল্লীতে এখন অদৃশ্য এক ভয়। নদীর ঘাট, খেয়াঘাট, বাজার কিংবা গ্রামাঞ্চলের আড্ডায়, সবখানেই একটাই আলোচনা ‘বনে গেলে ফিরতে পারব তো?’
স্থানীয়দের ভাষ্য, সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করতে গেলেই বনদস্যুদের কবলে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। ফলে অনেক জেলে এবার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বনে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। এতে ঈদের আগে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে পড়েছে। পরিবারে নেমে এসেছে চরম আর্থিক সংকট।
‘একসময় ঈদের আগে বনে গিয়ে ভালো মাছ-কাঁকড়া ধরে কিছু টাকা জমাতে পারতাম। কিন্তু এখন বনে যেতেই ভয় লাগে। বনদস্যুরা চাঁদা চায়, না দিলে ধরে নিয়ে যায়, নির্যাতন করে। সেই ভয়ে এবার আর যাইনি। এখন সন্তানদের নতুন কাপড় কিনে দেওয়াটাই চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে’, বলছিলেন শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ এলাকার জেলে রফিকুল গাজী।
একই হতাশার কথা জানান বুড়িগোয়ালীনী গ্রামের জেলে শফিকুল গাজী। তার ভাষ্য, ‘আমরা গরিব মানুষ। বনদস্যুরা ধরে নিয়ে গেলে পরিবারকে ধারদেনা করে মুক্তিপণ দিতে হয়। না দিলে মারধর করে, জাল-নৌকা নিয়ে যায়। এই অবস্থায় ঈদের আনন্দ কোথায়?’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও কয়েকজন জেলে এবং বাওয়ালী জানান, বনদস্যুদের দৌরাত্ম্য নতুন কিছু নয়। কয়েক বছর আগে আত্মসমর্পণের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছিল। কিন্তু এখন আবার আগের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
জেলেদের দাবি, আত্মসমর্পণকারী অনেক বনদস্যু পুনরায় দস্যুতায় জড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পশ্চিম সুন্দরবন এলাকায় মজনু বাহিনী, শরীফ বাহিনী, দয়াল বাহিনী, রবিউল বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, জাহাঙ্গীর বাহিনী, আবদুল্লাহ বাহিনী, নানা ভাই বাহিনী, মঞ্জুর বাহিনী ও মাসুম বিল্লাহ ভাগনে বাহিনীর মতো একাধিক সশস্ত্র চক্র সক্রিয়। তাদের কাছে জেলেরা যেন একপ্রকার ‘সহজ শিকার’।
সম্প্রতি সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণে গিয়ে ছয় বনজীবীর মধ্যে দুজন বনদস্যুদের হাতে অপহরণের শিকার হন। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তাদের উদ্ধার করা হয়। তবে এ ঘটনার পর থেকে জেলেদের মাঝে আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে। অনেকেই দস্যুদের অগ্রিম টাকা দিয়ে কার্ড করে বনে যাচ্ছেন। ধরা পড়লে নির্যাতনের শিকার হয়ে মোটা অংকের মুক্তিপণ দিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে বনজসম্পদ আহরণের জন্য আগামীতে আর কেউ বনে যেতে চাইবে না।
বনজীবীরা বলছেন, আগামী ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবন এলাকায় মধু সংগ্রহের মৌসুম শুরু হওয়ার কথা। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে মধু আহরণ কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। স্থানীয় মৌয়ালদের মতে, নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকেই বনে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি জীবিকার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে বন বিভাগের পক্ষ থেকে সীমাবদ্ধতার কথাই তুলে ধরা হচ্ছে। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান জানিয়েছেন, জনবল সংকট, আধুনিক সরঞ্জামের অভাব এবং বিশাল এলাকাজুড়ে নজরদারির সীমাবদ্ধতার কারণে এককভাবে অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে ঈদের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে যৌথ অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, বনদস্যু দমনে মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী, সমন্বিত ও ধারাবাহিক উদ্যোগ।
‘নামমাত্র অভিযান দিয়ে বনদস্যু সমস্যার সমাধান হবে না। প্রশাসনকে আরও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। উপকূলের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নিয়মিত ও পরিকল্পিত অভিযান চালাতে হবে। না হলে সাধারণ মানুষ কখনোই শান্তিতে থাকতে পারবে না’, অভিমত সাতক্ষীরা সুন্দরবন সুরক্ষা কমিটি সাধারণ সম্পাদক আহসান রাজীবের।
র্যাব-৬ এর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহমেদ মন্তব্য করেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলে মূল দায়িত্ব কোস্টগার্ডের হলেও তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে র্যাব সুন্দরবনে বনদস্যু ও জলদস্যু নির্মূলে যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করছে এবং এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’ তবে বাস্তবতা হলো, অভিযানের আশ্বাস আর মাঠের বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের ব্যবধান।

