হাওরে ধান কাটার চেয়ে কঠিন ঘরে তোলা

ছবি: আগামীর সময়
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের ধান পরিবহনের ডুবন্ত সড়কগুলোর বেহাল অবস্থা। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকরা। স্থানীয়ভাবে এসব সড়কগুলোকে কেউ জাঙ্গাল, আবার কেউ গোপাট নামে চেনেন। বছরের পর বছর সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এসব সড়ক। সামান্য বৃষ্টিতেই কাদা হয়ে যাচ্ছে সড়কগুলো। ফলে কাটা ধান খলায় (ধান মাড়াই বা শুকানোর জায়গা) নিতে গিয়ে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে কৃষকদের।
কৃষকদের অভিযোগ, হাওরে ধান কাটার চেয়ে কাটা ধান খলায় নিয়ে আসাই এখন বেশি কঠিন। কাদাময় ও ভাঙাচোরা পথে ধান বহন করতে গিয়ে সময়, শ্রম ও অর্থ তিনটিই বেশি খরচ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক ও যানবাহন নিয়েও বিপাকে পড়তে হচ্ছে তাদের।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের মাটিয়ান ও শানির হাওর, বিশ্বম্ভরপুরের খরচার হাওর, সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুরের দেখার হাওরসহ সব হাওরেই রয়েছে এমন সড়ক। বর্ষা মৌসুমে এসব সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যায়। শুকনো মৌসুমে বিশেষ করে বোরো ধান কাটার সময় এগুলোই কৃষকের ধান পরিবহনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে অধিকাংশ গোপাট এখন ভাঙাচোরা ও ঝুঁকিপূর্ণ। কোনোটি একেবারে ভেঙে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, প্রতিটি গোপাটের একাধিক স্থানে ভাঙন রয়েছে। কোথাও কোথাও বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। আবার কয়েক দিনের বৃষ্টিতেই এসব গোপাটে কাঁদা জমে যান চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। তখন ধান পরিবহনের জন্য বিকল্প উপায়ের চিন্তা করতে হয়। এতে বাড়ে কষ্ট ও ব্যয়।
তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের ধুতমা গ্রামের বাসিন্দা মরম আলী বললেন, ‘এবার টানা বৃষ্টিতে জাঙ্গালে পানি উঠে গেছে। কয়েক দিন ট্রলি দিয়ে ধান আনা গেলেও পরে রাস্তার অবস্থা এত খারাপ হয়েছে যে আর কোনো গাড়ি চলতে পারেনি। এবার ধান তুলতে যে কষ্ট হয়েছে, এমন কষ্ট আগে হয়নি।’
একই উপজেলার জামালগঞ্জ গ্রামের কৃষক আব্দুল হকের ভাষ্য, ‘প্রতিটি হাওরেই এ ধরনের সড়ক আছে। বর্ষায় এগুলো পানির নিচে থাকে, আর বোরো মৌসুমে ধান পরিবহনে কাজে লাগে। কিন্তু কোনো সময়ই এসব সড়কের উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যদি গোপাটগুলো পাকা করা হয়, তাহলে দূরের ক্ষেত থেকেও সহজে ধান আনা যাবে। এতে কৃষকদের কষ্ট অনেক কমবে।’
কৃষকদের দাবি, গোপাটগুলো আরসিসি ঢালাইয়ের মাধ্যমে পাকা করে মূল সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত করা হোক। এতে শুধু ধান পরিবহন সহজ হবে না, কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও কমবে। পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে হাওরাঞ্চলের মানুষের চলাচলও সহজ হবে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার (৭ মে) পর্যন্ত হাওরাঞ্চলে ৮৫ শতাংশ এবং নন-হাওর এলাকায় ৫৫ শতাংশ ধান কাটা শেষ। জেলায় মোট ধান কাটার হার ৭৭ শতাংশ। তবে বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার কারণে প্রাথমিকভাবে ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৩৯৫ হেক্টর জমি।
জেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন জানান, হাওরের অভ্যন্তরীণ সড়ক উন্নয়নে আগে একটি প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ হয়েছিল। এ জন্য প্রস্তাবনাও প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু পরে সেই প্রকল্প আর বাস্তবায়নের পর্যায়ে এগোয়নি।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক স্পষ্ট করেন, ‘হাওরাঞ্চলের কৃষকদের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো রাস্তা, যা স্থানীয়ভাবে ‘জাঙ্গাল’ নামে ডাকেন। এ বছর অতিবৃষ্টির কারণে এসব জাঙ্গাল চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তারপরও কৃষকরা অনেক কষ্ট করে ধান খলায় নিয়ে আসছেন। জাঙ্গালগুলো পাকা সড়কে রূপান্তর করা হলে কৃষকরা সহজে ধান পরিবহন করতে পারবেন এবং পরিবহন ব্যয়ও কমবে। এ বিষয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে।’
হাওরবাসীর এ দুর্ভোগের বিষয়টি জাতীয় সংসদেও তুলে ধরা হয়েছে। সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল হাওরাঞ্চলের ডুবন্ত সড়কগুলোর দ্রুত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, কৃষকের উৎপাদিত ধান নিরাপদে ঘরে তুলতে এসব সড়ক কার্যকর রাখা জরুরি।




