কাপাসিয়া বাজার নদীর পাড় এখন ময়লার ভাগাড়

ছবি: আগামীর সময়
গাজীপুরের কাপাসিয়ার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতলক্ষ্যা নদীর একটি অংশ ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। উপজেলা সদর বাজার, কসাইখানা ও আশপাশের বাসাবাড়ির প্রতিদিনের ময়লা-আবর্জনা দীর্ঘদিন ধরে নদীর তীরে ফেলা হচ্ছে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে এসব বর্জ্য সরাসরি নদীতে মিশে দূষিত করছে পানি। এতে একদিকে নদীর নাব্যতা কমছে। অন্যদিকে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন ঝুঁকি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বারবার অভিযোগ জানিয়েও এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সরেজমিন দেখা যায়, বাজারসংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে কয়েক শ গজ এলাকাজুড়ে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে পচা সবজি, ফলমূল, মাছ ও মাংসের উচ্ছিষ্ট, কসাইখানার বর্জ্য, পশুর নাড়িভুঁড়ি, মুরগির বর্জ্য, আখের ছোবড়া, দইয়ের টালি, প্লাস্টিক, পলিথিনসহ বিভিন্ন ধরনের কঠিন বর্জ্য। পাশেই রয়েছে ব্যস্ত খেয়াঘাট। প্রতিদিন শত শত মানুষ এ পথ দিয়ে চলাচল করলেও দুর্গন্ধে অনেককেই নাকে রুমাল চেপে চলতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শুধু বাজারের বর্জ্য নয়, প্রতিদিন একটি ভ্যানে করে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাসাবাড়ির ময়লাও এনে নদীর তীরে ফেলে রাখা হয়। বৃষ্টির সময় এসব বর্জ্য নদীতে মিশে পানির রং কালচে হয়ে যায়। নদীর তীরজুড়ে জমে থাকা প্লাস্টিক ও পলিথিন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহেও বাধা সৃষ্টি করছে।
খেয়াঘাট দিয়ে বাজারে আসা ক্রেতা আবদুল কাদের বললেন, বাজারে ঢোকার আগেই দুর্গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে। বিশেষ করে কাঁচাবাজার এলাকায় কয়েক মিনিটও দাঁড়িয়ে থাকা যায় না।
রাবেয়া বেগমের ভাষ্য, আগে বাজারে সন্তানদের নিয়ে আসতাম। এখন দুর্গন্ধ আর নোংরা পরিবেশের কারণে তাদের নিয়ে আসতে ভয় লাগে। মাছি-মশাও অনেক বেড়ে গেছে।
রিকশাচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম জানালেন, দিনভর এই এলাকায় থাকতে হয়। গরমের দিনে দুর্গন্ধ আরও বেড়ে যায়। অনেক যাত্রীও এ পথে আসতে চান না।
নাম না প্রকাশের শর্তে কয়েকজন ব্যবসায়ীরা বলেন, একসময় শীতলক্ষ্যা নদীর স্বচ্ছ পানিতে এলাকার মানুষ গোসল করতেন। এখন শ্রীপুর ও ভালুকার বিভিন্ন শিল্পকারখানার বর্জ্যের পাশাপাশি কাপাসিয়া বাজারের ময়লা-আবর্জনাও নদীতে মিশছে। ফলে পানির রং পরিবর্তন হয়েছে। নদীতে নামলে শরীরে চুলকানি, অ্যালার্জি ও বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ দেখা দেয়। আমরা দোকানে বসে থাকতে পারি না দুর্গন্ধে পেট ফুলে যায়। কেউ কোন প্রতিবাদ করে না।
তারা আরও বললেন, বহু বছর ধরে নদীর তীরে ময়লা ফেলে জায়গা ভরাট করা হচ্ছে। পরে একটি প্রভাবশালী মহল সেই ভরাট জায়গায় দোকানঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিচ্ছে। এতে নদীর জায়গা কমে যাচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী প্রিয়তুষ বলেন, বাজারে যারা কেনাকাটা করতে আসেন, তাদের অনেকেই দুর্গন্ধের কারণে দ্রুত চলে যান। এতে ব্যবসায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বাজারের জন্য আলাদা বর্জ্য ফেলার জায়গা জরুরি।
কাপাসিয়া বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যসচিব মো. সাইফুল ইসলাম শাহীন বললেন, বাজারের ময়লা ফেলার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ডাম্পিং স্টেশন নেই। তাই বাধ্য হয়েই নদীর তীরে বর্জ্য রাখা হচ্ছে। তবে এটি যে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রশাসন যদি নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ দেয়, তাহলে সমস্যার সমাধান সম্ভব।
তরগাঁও ইউনিয়ন জাতীয়তাবাদী দলের নেতা মিজানুর রহমান বলেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে ময়লা ফেলে নদী ভরাট করে জায়গা দখলের চেষ্টা করছে। এটি বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে নদীর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।
স্থানীয় শাকিল হাসান জানান, প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য নদীর তলদেশ ভরাট করছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে কয়েক বছরের মধ্যে এই অংশের নদী তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারাবে।
কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন চিকিৎসক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, পচা বর্জ্য থেকে জীবাণু ছড়িয়ে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, চর্মরোগ ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। জনবহুল এলাকার পাশে এ ধরনের উন্মুক্ত বর্জ্যের স্তূপ জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক।
পরিবেশবাদীদের মতে, নদীর তীরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বর্জ্য ফেলা পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের চেতনার পরিপন্থী। নদীকে বাঁচাতে বাজারভিত্তিক আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পৃথক ডাম্পিং স্টেশন, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
এ বিষয়ে কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজুল হক বলেন, নদীর তীরে ময়লা ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাজারের ইজারাদার চাইলে অন্যত্র বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা করতে পারেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। দ্রুত পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, বাজারের ইজারাদার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং প্রশাসনের সমন্বয়ের অভাবে বছরের পর বছর একই স্থানে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। তারা অবিলম্বে নদীর তীরে ময়লা ফেলা বন্ধ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ এবং শীতলক্ষ্যা নদী পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের ভাষায়, এখন ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো শীতলক্ষ্যাকে নদী নয়, একটি ময়লার ভাগাড় হিসেবেই চিনবে।




