ফেনীর সাঁতারের পুলে নীরবতা
- আড়াই দশকেও চালু হয়নি ফেনীর সুইমিং পুল

বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে পরিত্যক্ত কোনো ভবন। কাছে গেলে ছমছম করে শরীর। চারপাশের ঝোপঝাড় আর লতা যেন ভবনটিকে চেপে ধরেছে। পোশাক পরিবর্তনের কক্ষগুলোও আবর্জনায় ভরা, পুলের জমে থাকা পানিতে ভাসছে বর্জ্য। দিনের বেলাতেই যেখানে যেতে ভয় পান অনেকে, রাতে সেখানে বসে মাদকসেবীদের আড্ডা— এমনই দশা ফেনীর মাহবুব উল হক পেয়ারা সুইমিং পুলের। প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সুইমিং পুল উদ্বোধনের পর অল্প কিছুদিন শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণ হলেও গত আড়াই দশকে আর চালু হয়নি। ফলে যে উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল, সেই উদ্দেশ্যই এখন অনেকটা হারিয়ে গেছে।
জেলা ক্রীড়া সংস্থার তথ্য বলছে, ১৯৯৭ সালে পুলটির নির্মাণকাজ শুরু করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। দুই বছর পর প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হলে থেমে যায় প্রকল্পের কাজ। এক বছরের বিরতির পর আবার শুরু হয় কাজ। নির্মাণ শেষ হয় ২০০০ সালে। ক্রীড়া-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনুরোধে পুলটির নামকরণ করা হয় প্রয়াত সাংবাদিক ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব মাহবুব উল হক পেয়ারার নামে। অবশ্য নাম পেলেও দীর্ঘস্থায়ী কার্যক্রম পায়নি এটি।
পুলটি চালু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মাহবুব উল হক পেয়ারার ছেলে ও ক্রীড়া সংগঠক ইমন উল হক। তার ভাষায়, ‘পুলটি এত বছরেও চালু না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি চালু না থাকায় তাদের সন্তানরা সাঁতার শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’ তিনি মনে করেন, পুলটি দ্রুত চালু করা দরকার।
প্রায় আড়াই দশক ধরে পুলটি পড়ে থাকলেও নিয়োগ হয়নি লোকবল। নেই সাঁতার প্রশিক্ষক, নিরাপত্তাকর্মী কিংবা পানির মোটর পরিচালনার জন্য কর্মী। একটি ক্রীড়া স্থাপনা চালু রাখার জন্য যে ন্যূনতম ব্যবস্থাপনা দরকার, তার কোনোটিই এখানে নেই। লোকবল না থাকায় রক্ষণাবেক্ষণও হয়নি নিয়মিত। স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ এখন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
জেলা ক্রীড়া সংস্থার সূত্র বলছে, একাধিকবার পুলের বিভিন্ন উপকরণ চুরি হয়েছে। নিচতলার কক্ষগুলোও এখন আর ক্রীড়া কার্যক্রমের কাজে ব্যবহার হচ্ছে না। স্থানীয়দের ভাষায়, সেগুলো যেন গরু-ছাগলের গোয়ালঘর।
শুধু নিচতলার কক্ষ নয়, পুরো কমপ্লেক্সই এখন অনেকটা অরক্ষিত। রাতে বসে মাদকসেবীদের আড্ডা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থাপনাটির নিরাপত্তা ঝুঁকি। দোতলার বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। সেখানে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
তরুণ ক্রীড়া প্রশিক্ষক আলী আশরাফ ইমনের মতে, বন্যাপ্রবণ এই জেলায় মূলত শিশুদের সাঁতার শেখানোর উদ্দেশ্যেই সুইমিং পুলটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু এটি বন্ধ থাকায় সাঁতার শেখার সুযোগ পাচ্ছে না শিশুরা।
গত তিন মাসে ফেনীতে পানিতে ডুবে চার শিশু ও এক যুবকসহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শিশুদের সাঁতার শেখার জন্য তৈরি সুইমিং পুল বছরের পর বছর বন্ধ পড়ে থাকা অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
ব্যাংক কর্মকর্তা পলাশ সূত্রধরের দাবি, কিছুদিন পরপর ফেনীতে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এ কারণে সুইমিং পুলটি চালু করে শিশুদের নিয়মিত সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পুলটি চালুর বিষয়ে ক্রীড়া সংস্থাও উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সচিব সাইদুর রহমান জুয়েল জানিয়েছেন, তারা পুল চালুর চেষ্টা করছেন। এর মধ্যে দুটি সভায় এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। তিনি আশা করছেন, শিগগিরই ভালো খবর দেওয়া সম্ভব হবে।






