অচল পায়েই ৫০ বছর ধরে খেয়াঘাটের মাঝি রওশন

ছবিঃ আগামীর সময়
জীবন মানেই এক নিরন্তর সংগ্রাম। সেই সংগ্রামকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে নদীর বুকে নৌকা চালিয়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে চলেছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী মাঝি রওশন বেপারি। দুই পা সম্পূর্ণ অচল হলেও মানুষের কাছে হাত না পেতে অদম্য মনোবল আর মানসিক শক্তিকে পুঁজি করে আজও খেয়া পারাপার করছেন তিনি।
নদীর পাড়ে একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করা প্রায় ৭০ বছর বয়সী রওশন বেপারির জীবনের একমাত্র সম্বল একটি নৌকা। সেই নৌকাতেই ভর করে চলছে তার বেঁচে থাকার লড়াই। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কীর্তনাশা নদীতে খেয়া পারাপার করে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনো রকমে দিন কাটছে তার।
স্থানীয়রা জানান, রওশন বেপারি মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চরপখিরা এলাকার মৃত চানমিয়া বেপারির ছেলে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি বাতজ্বরে আক্রান্ত হন। অর্থাভাবে সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় ধীরে ধীরে তার দুই পা সম্পূর্ণ অচল হয়ে যায়। জীবিকার তাগিদে এক আত্মীয়ের নৌকা মাসিক বেতনে চালানো শুরু করেন তিনি।
পরবর্তীতে তার সততা, পরিশ্রম ও ভালো আচরণে মুগ্ধ হয়ে স্থানীয় লোকজন ও জনপ্রতিনিধিরা তাকে এই নদীতে খেয়া পারাপারের দায়িত্ব দেন। শুরুতে দুই পয়সা, পরে এক টাকা, তিন টাকা—মানুষ যা দিত তাই নিয়েই যাত্রী পারাপার করতেন তিনি। এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে চলছে তার জীবনসংগ্রাম।
স্থানীয়রা জানান, একসময় এই খেয়াঘাটে বেশ জৌলুস ছিল। কিন্তু আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার কারণে নদীপথে যাতায়াত কমে গেছে। ফলে এখন সারাদিনে খুব কম যাত্রী পারাপার হয়। এতে সংসার চালানো তার জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তার ছেলে থাকলেও তারা বাবা-মায়ের খোঁজ নেয় না। তাই নিজের উপার্জনেই টিকে থাকার চেষ্টা করছেন এই প্রতিবন্ধী মাঝি।
রওশন বেপারি বলেন, ‘আমার দুই পা চলে না, কিন্তু আল্লাহ আমাকে হাত দিয়েছেন। যতদিন পারি কাজ করে খাবো। কারও কাছে হাত পাততে ভালো লাগে না। তবে এখন বয়স হয়েছে, কাজ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সরকার যদি কোনো স্থায়ী সাহায্য বা কাজের ব্যবস্থা করতো, তাহলে শেষ বয়সে একটু শান্তিতে থাকতে পারতাম।’
তার ভাই মোকলেছুর বেপারি জানান, ছোটবেলা থেকেই রওশন বেপারির জীবন সংগ্রামের। প্রতিবন্ধী হয়েও তিনি কখনো কারও কাছে ভিক্ষা চাননি। এখন বয়সের ভারে নৌকা চালানো তার জন্য আরও কষ্টকর হয়ে উঠেছে। সরকার বা সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে তার জীবন কিছুটা সহজ হতে পারে।
রওশন বেপারির স্ত্রী সেতারা বেগম বলেন, ‘অনেক বছর ধরে আমি সংসার আর স্বামীকে আগলে রেখেছি। এখন তার পক্ষে কঠিন কোনো কাজ করা সম্ভব নয়। আমরা খুব কষ্টে আছি। সরকারের কাছে অনুরোধ, যেন আমাদের জন্য কোনো সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়।’
মাদারীপুর সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিশ্বজিৎ বৈদ্য নাদিম জানিয়েছেন, রওশন বেপারির বিষয়টি তাদের নজরে এলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে তাকে প্রতিবন্ধী ভাতা ও অন্যান্য সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

