চাঁদপুরে যেভাবে কিশোর ‘গ্যাং’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গ্রামের গলিপথ। এখানে-সেখানে কিশোরদের জটলা। দিন-রাত আড্ডা। তাদের আলাপের বিষয় লেখাপড়া বা খেলাধুলা নয়; ভয়াবহ সব টপিক। কখনো অস্ত্র, কখনোবা মাদক নিয়ে চলে কথা, তর্ক— সেই থেকে বিবাদ। তাদের ভয়ে জড়সড়ো এলাকাবাসী।
এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। কেন হলো, কীভাবে হলো? এর উত্তর খুঁজতে যেতে হবে চাঁদপুর। সেখানকার গ্রামে এখন হাতের নাগালে মাদক। কারবারিদের টার্গেট কিশোররাই। ‘বেকারত্ব, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, পারিবারিক নজরদারির অভাব, ডিজিটাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব— সব মিলিয়ে অপরাধের দিকে ঝুঁকছে তারা। একসময় সামাজিক বন্ধন ও পারিবারিক নজরদারি ছিল শক্ত। এখন অনেকটাই শিথিল। ঠিক এ সুযোগটিই নিচ্ছে অপরাধচক্র’— সমাজকর্মীদের বিশ্লেষণ।
‘সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাব। নতুন প্রজন্মকে ঠেলে দিচ্ছে ধ্বংসের মুখে। শুধু ব্যক্তি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরো পরিবার’— সামাজিক সংগঠন ‘আপন’-এর সাধারণ সম্পাদক আশিক বিন রহিমের প্রতিক্রিয়া। পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু প্রশাসনের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, জোরালো সামাজিক আন্দোলন জরুরি।
উঠে এসেছে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা। ‘আগে গ্রামে ছোটখাটো ঝামেলা হতো। মিটেও যেত। এখন কথায় কথায় মারামারি-হানাহানি। এমনকি খুনও। তাদের কাছে আছে দেশীয় অস্ত্র। অনেক সময় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রভাব বিস্তারেও তাদের কাজে লাগানো হয়। এতে নষ্ট হচ্ছে গ্রামের সুনাম’— এমনটাই মনে করেন চাঁদপুর সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের খেরুদিয়া গ্রামের আল আমিন।
কখন সন্তান খারাপ সঙ্গ বা মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে, বুঝে ওঠাই কঠিন হয়ে পড়েছে -মামুন তালুকদার, বাসিন্দা, নাজিরপাড়া, চাঁদপুর
কিশোরদের ভয় পায় সবাই। কেন পায়, সেই উত্তর পাওয়া যায় হাজীগঞ্জ পৌর এলাকার মিনহাজ রহমানের কথায়, ‘এখন কিশোররা খেলাধুলা করে না। আড্ডা দেয় অলিগলিতে। প্রকাশ্যেই নেয় মাদক। স্কুলের ইউনিফর্মেই জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন অপকর্মে, অপরাধে। ভয়ে অনেকেই তাই কিছু বলতে সাহস পায় না।’
অভিভাবকদের উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরেন চাঁদপুর শহরের নাজিরপাড়া এলাকার বাসিন্দা মামুন তালুকদার। কী বলবেন, ঠিক বুঝতে পারছেন না, ‘অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। কখন সন্তান খারাপ সঙ্গ বা মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে, বুঝে ওঠাই কঠিন হয়ে পড়েছে। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবও একটি বড় কারণ।’
কীভাবে বাড়ছে এই সংক্রমণ? মত তুলে ধরেন চাঁদপুর সরকারি কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আলমগীর হোসাইন, ‘সমাজের এমন কোনো স্তর নেই, যেখানে তাদের দেখা মেলে না। এক্ষেত্রে সামাজিক নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে, পারিবারিক মূল্যবোধ সবার আগে। মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাব যতই থাকুক, সামাজিক সচেতনতা ও মূল্যবোধেই এটি সমাধানে সক্ষম।’
সংকট মোকাবিলায় মিডিয়ারও ভূমিকা আছে বলে মনে করেন চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি সোহেল রুশদী। তার মতে, মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সমাজের সামনে তুলে ধরলে মানুষ সচেতন হবে।
কীভাবে সারতে পারে এই রোগ থেকে, সেটি তুলে ধরেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চাঁদপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রহিম বাদশা, ‘মাদক এখন শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। সহজলভ্য ও লাভজনক হওয়ায় বাড়ছে মাদক কারবারি। এর থেকে মুক্তি পেতে সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জোরদার, বেকারত্ব দূর এবং সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন’— বললেন এই সমাজকর্মী।
কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য নিয়ে কথা বললেন চাঁদপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. রবিউল হাসান। জানালেন, ‘মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। থানাগুলোকে জিরো টলারেন্স নীতি নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’




