তেলের সংকটে জেলের জালে শঙ্কা

ছবিঃ আগামীর সময়
আসছে পয়লা বৈশাখ। পাতে পাতে মাছে-ভাতে মাখামাখির দিন। অন্যান্য বছর এ দিন ঘিরে বরগুনার জেলেপাড়া থাকে জমজমাট। এবার সেখানে স্থবিরতা। জ্বালানির সংকট সড়ক পরিবহন ছাড়িয়ে পৌঁছেছে জেলের ট্রলারে। শূন্য জালে জমেছে শঙ্কা।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটি বরগুনার পাথরঘাটায়। কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ডিজেল সংকটে সাগরযাত্রায় ভাসছে না হাজারখানেক ট্রলার। এতে এক মাসে মাছ আহরণ কমেছে ১৮ হাজার কেজির বেশি। পয়লা বৈশাখ আর মাছ ধরায় সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময় ঘনিয়ে আসায় জেলেদের কপালে চিন্তার ভাঁজ।
ঝড়ে-বন্যাতেও সাগরে মাছ শিকার করেছেন বরগুনার নলি বন্দর এলাকার ভাই ভাই ট্রলারের জেলে রহিম মিয়া। এবার জ্বালানি সংকটে ১৫ দিন ধরে অলস বসে তিনি।
‘আমাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে।’
পাথরঘাটার পদ্মা এলাকার ‘মায়ের দোয়া’ ট্রলারের জেলে আব্দুর রব হাওলাদারের কণ্ঠেও স্পষ্ট আতঙ্ক।
‘১৫ এপ্রিল থেকে টানা ৫৮ দিন সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। তখন আমাদের বেকার থাকা লাগবে। তার উপর এখন ডিজেল না থাকায় মাছ ধরতে যেতে পারছি না। এত লম্বা সময় পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে সংসার চালাব বুঝে উঠতে পারছি না। সরকার যদি এখন তেলের ব্যবস্থা করত, তাহলে অন্তত একবার মাছ শিকারে যেতে পারতাম। কিছু মাছ পেলে সামনে ভালো দামও পাওয়া যেত। সেই টাকা দিয়ে নিষেধাজ্ঞার সময় কিছুটা হলেও পরিবার চালাতে পারতাম।’
'পহেলা বৈশাখে মাছ বেশি বিক্রির সুযোগ আসে। দামটাও ভালো পাওয়া যায়। এই টাকা দিয়ে জেলেরা ধার দেনাশোধ করে। এবার তো বিক্রি কমে যাবে বলেই মনে হচ্ছে'- আশঙ্কা বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরীর।
সংকট যতটা
পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ঘাট থেকে বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকারে যায় প্রায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি ট্রলার। এর মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে অন্তত ৫০ হাজার জেলে পরিবার। ডিজেলের তীব্র সংকটে এই ঘাটের হাজারের বেশি ট্রলার এখন অচল। কর্মহীন অন্তত ৩০ হাজার জেলে।
পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মার্কেটিং অফিসার মো. দেলোয়ার হোসেন তুলে ধরলেন সংকটের এই চিত্র। জানালেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এই কেন্দ্রে বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬৭৫ কেজি মাছ। তবে মার্চে তা কমে নেমেছে ২ লাখ ২৪ হাজার ৩০৭ কেজিতে। এক মাসেই বিক্রি কমেছে ১৮ হাজার ৩৬৮ কেজি।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য, একবারের সাগরযাত্রায় বরগুনার মাছের ট্রলারগুলোকে নিতে হয় ১৫ থেকে ২০ দিনের জ্বালানি। আকারভেদে ট্রলারপ্রতি প্রয়োজন হয় ১৫ থেকে ২০ ব্যারেল ডিজেল। প্রতি দুই সপ্তাহে জেলার মৎসখাতে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার লিটার। পাথরঘাটাতেই লাগে ৭০ হাজার লিটার।
এখন সংকট তীব্র। পাথরঘাটার জ্বালানি ব্যবসায়ীরা বলছেন, উপজেলায় মার্চে প্রতি সপ্তাহে এসেছে কেবল ৫ হাজার লিটার ডিজেল। এই সামান্য বরাদ্দ থেকে জ্বালানি দিতে হয় কৃষি, মৎস ও পরিবহনসহ অন্যান্য সব খাতে- জানালেন তেল ব্যবসায়ী ফারুক ট্রেডার্সের মালিক ফারুক হাওলাদার। ফলে জেলেদের ট্রলারে জুটছে না পর্যাপ্ত ডিজেল।
অসাধু ব্যবসায়ীতে নাজেহাল
সংকটের অজুহাতে অতিরিক্ত দামে গোপনে জ্বালানি তেল বিক্রি করছেন কিছু ব্যবসায়ী- অভিযোগ জেলে ও ট্রলারমালিকদের। ব্যারেলপ্রতি পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা বেশি দিয়ে ডিজেল কিনছেন কেউ কেউ।
‘যারা গোপনে জ্বালানি নিতে পারছেন, তাদেরকে ব্যারেলপ্রতি সরকারি মূল্য ১৯ হাজার টাকার বদলে দিতে হচ্ছে ২৫ হাজার টাকা’- দাবি পাথরঘাটার ট্রলার মালিক মাসুম চৌধুরীর।
অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে গতকাল শনিবার। পাথরঘাটার মেসার্স গাজী স্টোর নামের দোকানে মিলেছে ১৯০ ব্যারেল ডিজেল। দোকানমালিক আবদুল্লাহ গাজীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
যা বলছে প্রশাসন
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় গত বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিল জেলা প্রশাসন। সভায় ছিলেন জেলা মৎস বিভাগের কর্মকর্তারাও।
‘জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জ্বালানি সংকটের বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। আশা করি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সংকট সমাধান করা সম্ভব হবে’- প্রত্যাশা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিনের।
একই আশ্বাস উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপস পালের।
‘জ্বালানি তেল নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম, মজুদদারি বা সিন্ডিকেট কার্যক্রম বরদাশত করা হবে না। অবৈধ মজুদ ঠেকাতে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে’- হুঁশিয়ার করলেন ইউএনও।
















