রাজশাহীতে সমবায়ের প্রশিক্ষণের খাতায় মৃত ব্যক্তির নাম!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন ৫০ জন। তাদের জন্য বরাদ্দ হয়েছে সম্মানী, খাবার ও প্রশিক্ষণসামগ্রী। কিন্তু হাজিরা খাতা ও সম্মানী ভাতার মাস্টার রোল খুলতেই মিলেছে ভিন্ন চিত্র। সেখানে এমন একজনের নামও রয়েছে, যিনি মারা গেছেন।
কারও নামের সঙ্গে মিলছে না সমিতির পরিচয়। কোথাও ব্যবহার করা হয়েছে অন্য ব্যক্তির মোবাইল নম্বর। আবার তালিকায় নাম ও স্বাক্ষর থাকা কয়েকজন বলছেন, তারা ওই প্রশিক্ষণেই অংশ নেননি।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলা সমবায় কার্যালয়ের উদ্যোগে গত সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দিনব্যাপী এ প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়।
উপজেলার ২৫টি সমবায় সমিতির ৫০ জন সদস্য এতে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। প্রশিক্ষণার্থীদের প্রত্যেককে দেওয়া হয় ৫০০ টাকা সম্মানী। সঙ্গে সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার ও খাতা-কলম।
প্রশিক্ষণের প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহী জেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. আবু সাইফ। প্রশিক্ষক ছিলেন জেলা সমবায় কার্যালয়ের প্রশিক্ষক নাসির উদ্দীন।
কাগজে-কলমে প্রশিক্ষণ শেষ হলেও তালিকা যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় নিয়েই রয়েছে একাধিক প্রশ্ন।
অনুসন্ধানে অন্তত তিনটি সমিতির নাম, প্রশিক্ষণার্থীর পরিচয় ও মোবাইল নম্বরে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
সমবায় কার্যালয়ের একটি সূত্রের দাবি, ৫০ জনের মধ্যে অন্তত ২০ জন ‘ভুয়া’ প্রশিক্ষণার্থী।
তালিকার ১৯ নম্বরে ‘আশার আলো গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রয়েছে আজিবার রহমানের নাম। রয়েছে তার স্বাক্ষর। সম্মানী ও খাবার গ্রহণের তথ্যও দেওয়া হয়েছে।
তালিকায় দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করলে আজিবার রহমান বলেন, ‘তিনি চক মোক্তারপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক। ‘আশার আলো’ নামে তার কোনো সমিতি নেই। ওই সমিতির বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। প্রশিক্ষণেও তিনি অংশ নেননি।
এরপর ‘আশার আলো’ সমিতির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে পাওয়া যায় আরও গুরুতর তথ্য। সমিতিটির সাধারণ সম্পাদক মারা গেছেন। পদটি বর্তমানে শূন্য।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, ওই সমিতির কোনো সদস্যই প্রশিক্ষণে অংশ নেননি। অর্থাৎ যে সমিতির নামে একজনকে প্রশিক্ষণার্থী দেখানো হয়েছে, সেই সমিতির সাধারণ সম্পাদকই নেই। অথচ তার জায়গায় অন্য একজনের নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে- এমন প্রশ্নই সামনে এসেছে নথি যাচাইয়ে।
তালিকার ৭ নম্বরে রয়েছে ‘ভোরের আলো সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাধারণ সম্পাদক জিন্নাত আলীর নাম। সম্মানী গ্রহণের স্বাক্ষরও রয়েছে। কিন্তু তালিকায় দেওয়া মোবাইল নম্বরটি জিন্নাত আলীর নয়। নম্বরটির মালিক কালাম আলী। তিনি সাহাপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সদস্য।
কালাম আলী বলেন, ‘তিনি ওই প্রশিক্ষণে অংশ নেননি। তার মোবাইল নম্বর কীভাবে তালিকায় গেল, তাও তার জানা নেই। ভোরের আলো সমিতির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গেও কথা বলে জানা যায়, তাদের কেউ প্রশিক্ষণে অংশ নেননি। তালিকার ১৩ নম্বরে রয়েছে আরও একটি প্রশ্নবিদ্ধ তথ্য। সেখানে ‘জিদ সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মো. মাইনুল হকের নাম দেওয়া হয়েছে। আছে তার স্বাক্ষরও।
কিন্তু মাইনুল হক বলেছেন, ‘জিদ সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি’ নামে কোনো সমিতির কথা তিনি কখনো শোনেননি। সাধারণ সম্পাদক হওয়ার প্রশ্নই আসে না। তবে তিনি প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
তার ভাষ্য, যেখানে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছে, সেখানেই তিনি স্বাক্ষর করেছেন। অনুসন্ধানে ‘জিদ সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি’ নামে কোনো সমিতির অস্তিত্বও পাওয়া যায়নি। তালিকায় থাকা আরও অন্তত ছয়টি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করে সেগুলো বন্ধ পাওয়া গেছে।
চারঘাট উপজেলায় নিবন্ধিত সমবায় সমিতির সংখ্যা ৯২টি। এর মধ্যে কয়েকটির কার্যক্রম বন্ধ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সমবায়ী অভিযোগ করেছেন, প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে সব সমিতিকে সমান সুযোগ দেওয়া হয় না। পছন্দের কিছু সমিতিকে কেন্দ্র করেই প্রশিক্ষণের তালিকা করা হয়।
তাদের অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক সমিতির নামে অন্য ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণার্থী দেখানো হয়। এসব বিষয়ে আপত্তি জানালে সমিতির নিবন্ধন বাতিলের ভয় দেখানো হয়। এ কারণে অনিয়ম দেখেও অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
সমবায়ীদের কয়েকজন আরও অভিযোগ করেন, কিছু সমিতি সমবায়ের আড়ালে সুদের কারবারে যুক্ত। কোনো কোনো মৎস্যজীবী সমিতির বিরুদ্ধে সরকারি পুকুর কেনাবেচার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট সমিতিগুলো প্রশিক্ষণে গুরুত্ব পায় বলে তাদের দাবি। তাদের ভাষ্য, একটি প্রশিক্ষণে নয়, প্রায় প্রতিটি প্রশিক্ষণেই একই ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চারঘাট উপজেলা সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেছেন, সমবায়ীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য যে প্রশিক্ষণ, সেখানে নামে-বেনামে তালিকা করে অনিয়ম হলে দক্ষ সমবায়ী তৈরি হবে কীভাবে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন রাজশাহী জেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. আবু সাইফ। তিনি বলেছেন, ২৫টি সমিতির ৫০ জন সদস্য প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার কথা। তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সমবায়ীদের দক্ষতা বাড়ানো এবং আত্মকর্মসংস্থানমূলক উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যেই ছিল প্রশিক্ষণটি। কিন্তু সেই প্রশিক্ষণের হিসাবেই যখন মৃত ব্যক্তির নাম, অসংগত পরিচয় ও অন্যের মোবাইল নম্বরের তথ্য পাওয়া যায়, তখন প্রশ্ন উঠছে- ৫০ জনের প্রশিক্ষণে সত্যিই কতজন অংশ নিয়েছিলেন?



